November 30, 2025

আধুনিক প্রযুক্তির যুগে পড়ুয়া সংকটে গোঘাটের লাইব্রেরিগুলি – পাঠক টানতে উদ্যোগের খোঁজে গ্রন্থাগারগুলি

সোমালিয়া ওয়েব নিউজ; স্মার্টফোন আর সোশ্যাল মিডিয়ার দুনিয়ায় বইয়ের পাতা উল্টে মন দিয়ে পড়ার অভ্যাস যেন ক্রমেই হারিয়ে যাচ্ছে। এক সময় বই পড়া ছিল এক অনন্য আনন্দ, ছিল মনন গঠনের অন্যতম প্রধান মাধ্যম। সেই কারণেই বিভিন্ন এলাকায় সরকারি লাইব্রেরি গড়ে উঠেছিল পাঠাভ্যাস বাড়ানোর লক্ষ্যে। এখনও সেই লাইব্রেরিগুলি টিকে আছে ঠিকই, কিন্তু পাঠকের অভাবে আজ তারা প্রায় নিঃসঙ্গ।

গোঘাট থানার অন্তর্গত মোট ১০টি সরকারি লাইব্রেরি রয়েছে। অথচ এই দশটি গ্রন্থাগার পরিচালনার দায়িত্বে রয়েছেন মাত্র পাঁচজন লাইব্রেরিয়ান। কর্মচারীর সংখ্যা অর্ধেক হওয়ায় একেক জনকে দুইটি করে লাইব্রেরির দায়িত্ব সামলাতে হচ্ছে। ফলে প্রতিদিন সব লাইব্রেরি খুলে রাখা সম্ভব হয় না।

বেশ কিছু লাইব্রেরির ভিতরের অবস্থা আরও উদ্বেগজনক। পুরনো বইগুলির অনেকটাই দীর্ঘদিন রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে নষ্ট হয়ে গেছে। ধুলো, স্যাঁতস্যাঁতে পরিবেশ, উই পোকা, আলমারি ভেঙে যাওয়া—সব মিলিয়ে অসংখ্য মূল্যবান বই আজ অপ্রতুল যত্নের কারণে হারানোর মুখে। প্রতিটি লাইব্রেরিতেই আজও নিয়মিত ডাকযোগে নতুন পত্রিকা, সাময়িকী এসে পৌঁছোয়। কিন্তু পাঠক নেই বললেই চলে।

মোবাইল আসক্তি বাড়ছে, কমছে ধৈর্য–সংযম
স্থানীয়দের মতে, নতুন প্রজন্মের বেশিরভাগই মোবাইল ফোনেই ডুবে থাকে। পড়াশোনার বাইরেও ভিডিও, গেম, নোটিফিকেশন—সব মিলিয়ে মনোযোগ স্থির রাখাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ। বড়দের অভ্যাস দেখেই ছোটরাও মোবাইলকে সঙ্গী বানিয়ে ফেলছে। ফলে বই পড়ার ধৈর্য ও আগ্রহ দুই-ই কমছে দ্রুত।

গোঘাটের বেশিরভাগ ছাত্রছাত্রীই জানে না তাদের এলাকায় কোথায় কোথায় লাইব্রেরি আছে। পুজোর ছুটি বা গ্রীষ্মের ছুটি এলে এখনও কিছু বইপ্রেমী কিছু ছাত্র-ছাত্রী ও সাধারণ মানুষ বাড়িতে বই নিয়ে পড়তে যায়—এটুকুই সান্ত্বনা।

“সচেতনতা বাড়লে আবার ফিরবে পাঠক”— বলছেন লাইব্রেরিয়ান পম্পা দাস
গোঘাট শ্রীরামকৃষ্ণ পাঠাগারের লাইব্রেরিয়ান পম্পা দাস জানান,

“এলাকার স্কুলগুলিতে যদি বই পড়া নিয়ে সচেতনতা বাড়ানো যায়, তাহলে আগামী দিনে পাঠক সংখ্যা নিশ্চয়ই বাড়বে। মোবাইলের প্রতি অতিরিক্ত আসক্তিও কমবে। শিশুদের ছোটবেলা থেকেই লাইব্রেরির সঙ্গে যুক্ত করতে হবে।”

তাঁর মতে, বই পড়ার অভ্যাস ফিরিয়ে আনতে স্কুলের সহযোগিতা অত্যন্ত জরুরি। বইমেলা, পাঠচক্র, পাঠ–অনুষ্ঠান করলে ছাত্রদের আকৃষ্ট করা সম্ভব।

লাইব্রেরি পরিচালনায় সংকট
প্রশাসনিক দৃষ্টিকোণ থেকে সবচেয়ে বড় সমস্যা কর্মচারীর ঘাটতি।

  • মাত্র ৫ জন কর্মী দিয়ে ১০টি লাইব্রেরি চালানো কঠিন।
  • নিয়মিত খোলা না থাকায় পাঠক আসে না, আর পাঠক না থাকায় লাইব্রেরির প্রাণশক্তি ক্রমেই ক্ষয় হচ্ছে।
  • পুরনো বইগুলির সংরক্ষণে নেই পর্যাপ্ত তহবিল বা কর্মী।

সমাধানের পথে কী?
স্থানীয় শিক্ষামহল ও বইপ্রেমীদের দাবি—

  • নিয়মিত লাইব্রেরি খোলা
  • রক্ষণাবেক্ষণের জন্য আলাদা তহবিল
  • স্কুল–কলেজে বই পড়া নিয়ে সচেতনতা কর্মসূচি
  • ডিজিটাল ক্যাটালগ বা ই–লাইব্রেরি ব্যবস্থা
  • স্থানীয় সাংস্কৃতিক সংগঠনের মাধ্যমে পাঠাভ্যাস উৎসাহ

সব মিলিয়ে গোঘাটের লাইব্রেরিগুলি আজ এক সন্ধিক্ষণে। প্রযুক্তির যুগে বইকে বাঁচাতে হলে দরকার পরিকল্পিত উদ্যোগ, তাজা ভাবনা এবং পাঠাভ্যাস তৈরি করার নতুন পথ। নইলে সরকারি লাইব্রেরিগুলি শুধু নামেই টিকে থাকবে, বাস্তবে নয়—এটাই আশঙ্কা এলাকাবাসীর।

Loading