সোমালিয়া ওয়েব নিউজ:বাংলার মাটিতে যখন বাউল গানের সুরে ভেসে যেত জনপদ, তখন সেই সুরের এক নিষ্ঠাবান সাধক ছিলেন অনন্ত দাস বাউল। আজ বয়স তাঁর ৯৩ বছর। একসময় সুরের ঝর্ণাধারায় যিনি মুগ্ধ করতেন রাজ্য থেকে রাজ্যান্তরে, সেই শিল্পী আজ চরম আর্থিক সংকটে ভুগছেন। স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়ে আজ প্রায় নিঃস্ব, অসহায় এই বাউল শিল্পীর এখন ওষুধ কেনার সামর্থ্যটুকুও নেই।
রামজীবনপুরের পাশে ছোট্ট গ্রাম দ্বারখোলা(লক্ষীপুর পঞ্চায়েত) — সেখানেই জন্ম অনন্ত দাসের। ছোটবেলাতেই পিতৃহারা। সংসারের ভার কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন তাঁর মা ও ঠাকুমা। অন্নের টানে শৈশবে কাজ করেছেন চায়ের দোকানে, মিষ্টির দোকানে। পরে জীবিকা খুঁজে পান মৃৎশিল্পীর কাজে — রামজীবনপুরের বিখ্যাত মৃৎশিল্পী অজিত মুখার্জির শিষ্য হয়ে শিখেছিলেন ঠাকুরের মূর্তি গড়ার কাজ।
কিন্তু নিয়তির অন্য লেখা ছিল তাঁর জন্য। মাটির গন্ধ ছাপিয়ে সুরের মাটির ঘ্রাণ টানতে শুরু করে তাঁকে। বাঁকুড়ার নামজাদা বাউল নিমাই দাসের কাছে হাতে খড়ি নেন অনন্ত দাস। সেখান থেকেই শুরু হয় তাঁর সুরের যাত্রা — লোকসংস্কৃতির, মানবধর্মের, ভালোবাসার পথে।
ভাগ্যের টানে ঘুরতে ঘুরতে তিনি পৌঁছন হুগলি জেলার গোঘাটের রাঘুবাটি গ্রামে, যেখানে এক ‘মা’-এর স্নেহে আশ্রয় পান। সেখানেই তাঁর তৈরী ছোট্ট আশ্রম — সুর আর সাধনার নিবাস।
কলকাতা থেকে টাটানগর — রাজ্যের ভেতরে-বাইরে অসংখ্য মঞ্চ কাঁপিয়েছেন অনন্ত দাস বাউল। তাঁর গান বাজেছে আকাশবাণীতে, প্রকাশিত হয়েছে বহু ক্যাসেট। জাপান, বাংলাদেশ থেকেও আমন্ত্রণ এসেছিল, কিন্তু তিনি যাননি — কারণ, তাঁর প্রাণ পড়ে ছিল বাংলার মাটির গন্ধে। অনন্ত দাস বলেছেন “শহরের কংক্রিটের জঙ্গল আমার পক্ষে নয়। আমি মাঠে, গাছতলায়, মানুষের মাঝে গাইতে ভালোবাসি। এই গ্রামীণ হাওয়াতেই আমি বাঁচি।গ্রামে আছি তাই এখনো বেঁচে আছি। ”
কিন্তু আজ সেই মানুষটাই মৃত্যুপথযাত্রী জীবন নিয়ে লড়ছেন দারিদ্রের সঙ্গে। কয়েক মাস আগে স্ট্রোকে আক্রান্ত হওয়ার পর থেকেই শরীর ভেঙে পড়েছে। গলার সুর ক্ষীণ, স্মৃতিশক্তি প্রায় হারিয়েছেন। তাঁর কথায়,“অনেকেই একসময় পাশে ছিল, এখন কেউ আসে না। আগে যখন গাইতাম, সবাই ভালোবাসতো। এখন আমি কারও মনে নেই।”“অনেকেই একসময় পাশে ছিল, আগে যখন গাইতাম, সবাই ভালোবাসতো। আগে সবাই আমার থেকে চুষে নিয়েছে এখন কেউ আসে না। ,এখন আমি কারও মনে নেই।”
তাঁর তৈরি করা অনেক খ্যাতনামা বাউল শিল্পী আজ প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন —
যেমন গোষ্ঠ গোপাল দাস ও সাধন বৈরাগী, দু’জনেই দীর্ঘদিন অনন্ত দাসের আশ্রমে থেকে গান শিখেছেন। কিন্তু আজ তিনি যখন অসহায়, তখন তাঁর শিষ্য ভক্তরা কেউ পাশে নেই।
সরকারের পক্ষ থেকে মাসে মাত্র ২০০০ টাকা অনুদান পান অনন্ত দাস। তাতে সংসার তো দূরের কথা, ওষুধের খরচও ওঠে না।
অভিমানের সুরে তিনি বলেন — “সম্মান পেয়েছি অনেক, কিন্তু সম্মানে পেট ভরে না। এখন ভিক্ষা করতে হয় ওষুধ কেনার জন্য।”
ঘরের দেওয়ালে ঝুলছে নানা সম্মানপত্র ও পুরস্কার, কিন্তু মাটির শিল্পীর মাটির ঘর আজ ভিজে আছে কষ্টের অশ্রুতে।
তবুও তাঁর বিশ্বাস অটুট —“বাউল গান মরবে না। হয়তো আমরা হারিয়ে যাবো, কিন্তু সুর থাকবে। কিন্তু এখন যারা গান করছে, তারা বিকৃত করছে সেই সুরকে। পুরনো বাউল ভাব নেই তাদের মধ্যে।”
তিনি একসময় বাংলাদেশের ফকির শাহ আব্দুল করিমের সঙ্গেও গান গেয়েছেন। অথচ আজ সেই মানুষই নিজের চিকিৎসার জন্যও ভিক্ষার আশ্রয়ে।
আমরা কথা বলে যখন ফিরছিলাম অনন্ত দাসের আশ্রমে, তখন সন্ধ্যা নেমে এসেছে। তুলসী তলায় তখন প্রদীপের আলো, হাতে পুরনো দিনের লণ্ঠন নিয়ে সন্ধ্যা দিচ্ছেন কয়েকজন আশ্রমিক। বাতাসে বাজছে একতারা, এক মহিলা আশ্রমিকের কণ্ঠে ভেসে আসছে পুরনো এক বাউল সুর,আলো-অন্ধকারে দুলে ওঠা সেই সুরের মধ্যে যেন মিশে গেল অনন্ত দাসের জীবনের দীর্ঘ সাধনার ছায়া।
এই প্রতিবেদনের মাধ্যমে আমরা সংবাদ সোমালিয়া সকল বাউলপ্রেমী, শিষ্য, ভক্ত ও সাধারণ মানুষদের কাছে আন্তরিক আবেদন জানাচ্ছি — —
এই মাটির সন্তান, বাংলার সুরের সাধক অনন্ত দাস বাউল যেন ন্যূনতম সরকারি সাহায্য ও চিকিৎসা সুবিধা পান। বাউল সঙ্গীত শুধু একধরনের গান নয় — এটি আমাদের মাটির গন্ধ, মানুষের ভালোবাসা, আর আত্মার মুক্তির পথ।
আজ সেই পথের এক নিবেদিত সাধক, অন্তর্যামী অনন্ত দাস বাউল, জীবনের সন্ধিক্ষণে এসে দাঁড়িয়েছেন নিঃস্ব ও অসহায় অবস্থায়। আপনারা যারা সমাজের বিভিন্ন কর্মক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত, যদি প্রত্যেকে সামান্য উদ্যোগে একটু ভালোবাসার হাত বাড়িয়ে দেন,
তাহলে এই প্রবীণ বাউল সাধক জীবনের বাকি ক’টা দিন আমাদের সমাজে মর্যাদার সঙ্গে, শান্তিতে কাটাতে পারবেন। তাঁর কণ্ঠে আজও বেঁচে আছে সেই চিরন্তন সুর —
আসুন আমরা সকলে মিলে সেই সুরের প্রতি শ্রদ্ধা জানাই —
একটু সহায়তার মাধ্যমে তাঁর পাশে দাঁড়াই।
অনন্ত দাস বাউলের ব্যাংক অ্যাকাউন্টের বিবরণ নিচে দেওয়া হলো —
(যাঁরা ইচ্ছুক, তাঁরা সরাসরি এই অ্যাকাউন্টে সাহায্য পাঠাতে পারেন)
ব্যাংকের নাম: WEST BENGAL GRAMIN BANK, BRANCH–MODINA অ্যাকাউন্ট নম্বর: …10780100005700
IFSC কোড: PUNB0RRBBGB
অ্যাকাউন্ট হোল্ডার: ANANTADAS BAIRAGI, মোবাইল -9800542680
একটুখানি সাহায্য হয়তো খুব ছোট মনে হতে পারে,
কিন্তু সেটিই কারও জীবনের সবচেয়ে বড় আশীর্বাদ হয়ে উঠতে পারে।
শেষে তাঁর কণ্ঠে উচ্চারিত কিছু শব্দ যেন পুরো এক প্রজন্মের বেদনা — “সাধনার জীবন কাটালাম, কিন্তু শেষ বয়সে গান নয়, ভিক্ষার হাঁড়ি নিয়েই ঘুরছি। এটাই কি আমার পুরস্কার?”
বাংলার এই প্রৌঢ় সাধকের সুর যদি আবার জেগে ওঠে — তবে সেটাই হবে প্রকৃত বাউলধর্মের জয়।

![]()

More Stories
বৈষম্যহীন সমাজ গঠনের লড়াই আজও প্রাসঙ্গিক — আরামবাগের সিপিআইএমের নেতা সমীর চক্রবর্তীর অভিজ্ঞতায় উঠে এল সংগঠনের বাস্তবতা
আধুনিক প্রযুক্তির যুগে পড়ুয়া সংকটে গোঘাটের লাইব্রেরিগুলি – পাঠক টানতে উদ্যোগের খোঁজে গ্রন্থাগারগুলি
কোলাহলের মাঝেই চলছে অখণ্ড হরিনাম— হুগলির বদনগঞ্জের কয়াপাট বাজারের মন্দিরে ৪৬ বছরের ঐতিহ্য