February 4, 2026

বহুমুখী প্রতিভার আলোকবর্তিকা : হরিপ্রসাদ মেদ্দা

সোমালিয়া ওয়েব নিউজঃ জন্ম ১৯৩২ খ্রিস্টাব্দ, জন্মাষ্টমীর মধ্যরাত। পুণ্যময় সেই লগ্নেই বাংলার গ্রামীণ মাটিতে জন্ম নিয়েছিলেন শিল্প–সাহিত্য–সংস্কৃতির মানুষ হরিপ্রসাদ মেদ্দা। অতি শৈশবেই বাবা–মা’কে হারানো অভিভাবকহারা এক অনাথ বালকের জীবন পরবর্তী সময়ে যে সমগ্র ভারতের শিল্প–সংস্কৃতির ইতিহাসে এক উজ্জ্বল অধ্যায় হয়ে উঠবে— তা ছিল কল্পনারও অতীত। পড়াশোনায় অসামান্য মেধার পরিচয় দিয়ে প্রবেশিকা পর্যন্ত প্রতিটি শ্রেণীতেই প্রথম তিনের মধ্যে স্থান ধরে রেখেছিলেন তিনি।

গ্রামের পাঠশালা ও প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শুরু তাঁর শিক্ষার পথ। পরে তিনি পড়াশোনা করেন কালীপুরের স্বামীজি মধ্য ইংরেজি বিদ্যালয় ও আরামবাগ উচ্চ ইংরেজি বিদ্যালয়ে। উচ্চশিক্ষার জন্য ভর্তি হন নেতাজি মহাবিদ্যালয়ে, সেখান থেকে পাড়ি দেন শান্তিনিকেতনের বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে। নাচ–গান শেখেন সংগীতভবনে। মানবসেবার আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে রেডক্রশ প্রশিক্ষণ নেন আলিপুরে। হিন্দি ভাষা ও সাহিত্যে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা গ্রহণ করেন ‘কোভিদ’ এবং ওয়ার্দার কোবিদ বিশ্ববিদ্যালয়ে। পাঁচ–সাতটি ভাষায় সাধারণ দখল ছিল তাঁর— ভাষাচর্চায় তাঁর আগ্রহ ছিল আজীবনের।শিল্পসাধনা

শান্তিনিকেতনের কলাভবনই ছিল তাঁর সৃষ্টিশীল জীবনের কেন্দ্রবিন্দু। আচার্য নন্দলাল বসুর একান্ত স্নেহধন্য হয়ে সেখানেই শেখেন চারুশিল্প, কারুশিল্প, লোকশিল্প এবং ভাস্কর্য। নিজের আঁকা ছবির সংখ্যা সহস্রাধিক।

দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ও শহরে তাঁর শিল্পকর্মের প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়েছে— আরামবাগ উচ্চ বিদ্যালয়, নেতাজি মহাবিদ্যালয়, গোবিন্দপুর রামকৃষ্ণ উচ্চ বিদ্যালয়, কলকাতার রামমোহন স্মৃতিসৌধ, কাশীর বসন্ত মহাবিদ্যালয়, বোম্বাই আর্ট স্কুল, কোয়েম্বাটুরের আন্তর্জাতিক সংস্থা এবং কলকাতার ফাইন আর্ট একাডেমি–সহ বহু জায়গায়।

শিল্পশিক্ষক ও শিল্প নির্দেশক হিসাবে তিনি কর্মরত ছিলেন ভারতের একাধিক রাজ্যের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেও। শতাধিক বইয়ের প্রচ্ছদ ও অলংকরণ তাঁর তুলিতে প্রাণ পেয়েছে। স্কুলের পাঠ্যবই রচনা, সম্পাদনা এবং চিত্রায়ণের কাজেও রয়েছে তাঁর গুরুত্বপূর্ণ অবদান।

অল্প বয়স থেকেই মফস্সল ও কলকাতার নানা সংবাদপত্র–পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে তাঁর লেখা— গল্প, উপন্যাস, কবিতা, প্রবন্ধ, রসরচনা, ছড়া ও নাটক। সাহিত্যের সব শাখাতেই ছিল তাঁর অবাধ বিচরণ।

তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থ সংখ্যা প্রায় দশটি। তবে অর্ধশতাধিক পাণ্ডুলিপি এখনও যন্ত্রস্থ অবস্থায় প্রকাশের অপেক্ষায়। হিন্দি ভাষায় লেখা কয়েকটি নাটক বেতারে প্রচারিত হয়। উর্দু শায়রির অনুবাদ গ্রন্থও রচনা করেছেন তিনি— সাহিত্য অনুবাদের ক্ষেত্রেও রেখে গেছেন নিপুণ স্বাক্ষর।

গান–বাজনা, নাচ ও অভিনয় ছিল তাঁর জীবনের আরেক বড় অধ্যায়। থিয়েটার ও যাত্রাজগতের সঙ্গে যুক্ত থেকে প্রায় ৫০টি নাটকে অভিনয় করেছেন তিনি। রবীন্দ্র নৃত্যনাট্যে অংশ নিয়ে দিল্লি এবং বাংলাদেশেও অভিনন্দিত হন। অভিনয় দক্ষতার জন্য পেয়েছেন প্রচুর পদক ও সংবর্ধনা।

গ্রাম বাংলার বহু নাট্য, সংগীত ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তিনি যুক্ত ছিলেন। কোন্নগর, বর্ধমান, কলকাতা–সহ বিভিন্ন নাট্য প্রতিযোগিতা ও সাংস্কৃতিক উৎসবে পুরস্কার লাভ করেছেন বহুবার।

খেলাধূলায়ও সমান উৎসাহী ছিলেন হরিপ্রসাদ। ক্যারাম ও তাসের ব্রিজ খেলায় আরামবাগ অঞ্চলের এক সময়ের চ্যাম্পিয়ন ছিলেন তিনি। ফুটবল, ভলিবল ও হকিতেও ছিল তাঁর দক্ষতা।

শান্তিনিকেতনে তিনি খেলেছেন মোহনবাগান, ইস্টবেঙ্গল ও জর্জ টেলিগ্রাফের মতো বিখ্যাত কলকাতার ক্লাব দলের সঙ্গে। কাশী–বেনারসে নিয়মিত হকি ও ক্রিকেট খেলেছেন বলেও জানা যায়।

ভ্রমণ ছিল তাঁর এক বিচিত্র নেশা। ঘর ছেড়ে বহুবার বেরিয়ে পড়েছেন অজানা পথে। পরবর্তীকালে কর্মসূত্রে ঘুরেছেন কন্যাকুমারী থেকে কেদার–বদ্রী, আসমুদ্রহিমাচল— ভারতের প্রায় সমস্ত দর্শনীয় স্থান তিনি দেখেছেন, স্কেচ এঁকেছেন এবং লিখেছেন ভ্রমণকাহিনীও।

ব্যক্তিগত জীবনে তিনি অকৃতদার হলেও ‘মানুষ’ই ছিল তাঁর কাছে শ্রেষ্ঠ ধর্ম। মানবিকতায় বিশ্বাসী এই কর্মযোগী সারাজীবন দাঁড়িয়েছেন সাধারণ মানুষের পাশে, বিশেষ করে অভাবী ছাত্রছাত্রীদের জন্য। বিনা পারিশ্রমিকে পড়ানো, বই–খাতা–রং–তুলি কিনে দেওয়া এবং স্কুল–কলেজে ভর্তির উদ্যোগ নেওয়ার কাজ করেছেন নিরলসভাবে।

তাঁর স্নেহ ও সাহায্য পেয়ে বহু ছাত্রছাত্রী আজ জীবনে প্রতিষ্ঠিত— কেউ অধ্যাপক, কেউ শিল্পী, কেউ কবি, আবার কেউ বা উচ্চপদস্থ চাকুরে।

বিরল সংগ্রহে সমৃদ্ধ তাঁর ব্যক্তিগত সংগ্রহশালায় রয়েছে— বিভিন্ন ভাষার বই, হস্তশিল্প ও পুতুল, পুরোনো পুঁথি, টেরাকোটা, দুর্লভ স্ট্যাম্প, খ্যাতনামা শিল্পী–সাহিত্যিক–নেতাদের পেপার কাটিং, দেশলাইয়ের লেবেল, মিনিবই, মিনিপত্রিকা, চামচ, গ্লাস, পেন–সহ অসংখ্য সাংস্কৃতিক নিদর্শন।

সংবর্ধনা ও স্বীকৃতি

তাঁর অসামান্য কর্মের জন্য স্থানীয় ও রাজ্যস্তরে বহুবার সম্মানিত হয়েছেন তিনি—
• আরামবাগের অগ্রণী, সবুজয়ন, সুরসপ্তক ও সাহিত্য–শিল্প পরিষদের পক্ষ থেকে সংবর্ধনা, বলিবেলা সরস্বতী শিশু মন্দির থেকে সংবর্ধনা,
• মুখ্যমন্ত্রী প্রফুল্লচন্দ্র সেনের হাত থেকে শ্রেষ্ঠ শিল্পীর সম্মাননা,
• দিল্লির প্রজাতন্ত্র দিবসে পশ্চিমবঙ্গের ট্যাবলো ডিজাইনের জন্য জাতীয় পুরস্কার,
• ১৯৯৫ সালে সুকান্ত পুরস্কার,
• ২০১০ সালে নন্দন সংবর্ধনা,
• ২০১১ সালে দৈনিক টেলিগ্রাফের পক্ষ থেকে সারাজীবনের স্বীকৃতি।

পশ্চিমবঙ্গ সরকারের তথ্য ও সংস্কৃতি বিভাগের পক্ষ থেকেও তিনি পেয়েছেন শ্রেষ্ঠ শিল্পীর পুরস্কার ও সংবর্ধনা। দূরদর্শনে একাধিক বার তাঁর সাক্ষাৎকার প্রচারিত হয়েছে শিল্প ও সংস্কৃতি বিভাগ থেকে।

কর্মজীবন থেকে অবসর নেওয়ার পরেও তিনি আরও গভীরভাবে যুক্ত হয়েছেন সমাজ, সংস্কৃতি ও সৃষ্টিশীল নানা কর্মকাণ্ডে। জীবন সায়াহ্নেও তাঁর একমাত্র চিন্তা— মানুষ নৈতিকভাবে উন্নত হোক, সুস্থ ও রুচিশীল হোক, এবং তাদের সংগ্রামী জীবনে শিল্প–সাহিত্য–সংস্কৃতি হয়ে উঠুক আনন্দ ও শুদ্ধতার পাথেয়। জীবনে প্রেম–ভালোবাসার আলো এসেছিল তাঁরও। কিন্তু সম্পর্কের সেই অনুভূতিগুলি শেষ পর্যন্ত রয়ে গিয়েছিল একতরফা— যাঁদের তিনি আপন ভেবেছিলেন, তাঁরা প্রত্যেকেই প্রয়োজনে ব্যবহার করে সরে গেছেন। পারস্পরিক স্বীকৃতি বা আন্তরিকতার আশ্রয় তিনি পাননি। এই না–পাওয়ার চাপা অভিমান, অনুচ্চারিত দুঃখ তাঁর হৃদয়ের গভীরে দীর্ঘ ছায়া ফেলেছে। আজও কখনও সেই স্মৃতি সামান্য হলেও তাঁকে কষ্ট দেয়।

মানুষকে ভালোবাসা দিয়ে আগলে রাখলেও, ভালোবাসার বিনিময়ে বিশ্বাসের আঘাত তাঁকে সংসারী হতে দেয়নি। সেই কারণেই ব্যক্তিগত সংসারের পথে হাঁটেননি তিনি। নিজেকে গুটিয়ে নেওয়ার জন্য নয়, বরং নিজেকে সম্পূর্ণভাবে মানুষের কল্যাণে নিবেদন করার জন্যই নিঃসঙ্গতার পথ বেছে নিয়েছেন এই চির–রবীন্দ্রানুরাগী মানুষ— যাঁর কাছে জীবন মানেই কর্ম, জীবন মানেই সৃষ্টির উৎসব।

ব্যক্তিগত আঘাত–অভিমানকে সঙ্গে নিয়েও তিনি বারবার প্রমাণ করেছেন— মানুষের পাশে দাঁড়ানোই জীবনের প্রকৃত অর্জন। তাঁর কথায়, শিল্প, শিক্ষা, সাহিত্য আর মানবিকতার পথেই তিনি খুঁজে পেয়েছেন আত্মমুক্তির অর্থ।

মানুষপ্রেমী এই রবীন্দ্রানুরাগী ব্যক্তিত্ব বারবার উচ্চারণ করেন—
“সবার উপর মানুষ সত্য।”

Loading