অর্ধশতাব্দীর রাজনৈতিক পথচলায় সংগ্রাম, আত্মত্যাগ ও অভিজ্ঞতার এক অনন্য দৃষ্টান্ত
সোমালিয়া ওয়েব নিউজ; দীর্ঘ পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে রাজ্যের বাম রাজনীতির এক সক্রিয় কর্মী, সংগঠক এবং জনমানুষের পাশে দাঁড়ানো এক যোদ্ধা—মোজাম্মেল হোসেন। কিছুদিন পরই তিনি ৭৬ বছরে পা দেবেন। শরীর এখনও সবল, কর্মতত্পরতা একই রকম, কিন্তু স্ত্রী ও দুই পুত্রের অকাল প্রয়াণ আজও তাঁকে গভীরভাবে আঘাত করে। শারীরিকভাবে সুস্থ হলেও মানসিক শূন্যতার যন্ত্রণায় দিন কাটে তাঁর।
নকশালি রাজনীতি থেকে সরে আসা
মোজাম্মেল হোসেনের রাজনৈতিক যাত্রা শুরু ১৯৭০ সালে, কলকাতার ইডেন গার্ডেনে লেনিনের জন্মশতবর্ষ উদ্যাপন অনুষ্ঠানে। তরুণ বয়সের উৎসাহে তখনকার প্রচারিত উগ্র বামপন্থার সঙ্গে যোগাযোগ গড়ে ওঠে। নকশালি আন্দোলনের প্রতি আকর্ষণ বাড়লেও অল্পদিনেই তিনি দেখতে পান সশস্ত্র পথের ভয়াবহতা, সমাজে সন্ত্রাসের নির্মম চেহারা। তাঁর নিজের ভাষায়, “নকশালদের রাজনীতি গঠনমূলক ছিল না, সমাজকে ভাঙার রাজনীতি ছিল।”
এই উপলব্ধিই শেষ পর্যন্ত তাঁকে নকশালি পথ থেকে সরে আসতে বাধ্য করে।
কলেজে নাশকতা রুখে ‘বিপ্লব নয়, গঠন’-এর পথ
আরামবাগের নেতাজি মহাবিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলেন মোজাম্মেল। ১৯৭২-৭৩ সালের দিকে নকশালপন্থিরা কলেজের কেমিস্ট্রি ল্যাবরেটরি জ্বালিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা করলে তিনিই প্রথম এগিয়ে এসে নাশকতা রুখে দেন। সেই ঘটনার পর তাঁর রাজনৈতিক ধ্যানধারণায় বড় পরিবর্তন আসে।
১৯৭৬ সালে সিপিআই(এম)-এর সদস্যপদ
নকশাল রাজনীতিতে যুক্ত থাকার কারণে তৎকালীন সিপিআই(এম) নেতৃত্ব দীর্ঘদিন তাঁকে পর্যবেক্ষণে রাখে। সবশেষে ১৯৭৬ সালে তাঁকে আনুষ্ঠানিকভাবে পার্টির সদস্যপদ দেওয়া হয়। সেই থেকেই শুরু তাঁর লম্বা রাজনৈতিক অধ্যায়।
পঞ্চায়েতি রাজ ব্যবস্থায় একচেটিয়া ভূমিকা
১৯৭৮ সাল থেকে ২০১৩ পর্যন্ত তিনি বিভিন্ন ভোটযুদ্ধে অংশ নেন। শুধুমাত্র নির্বাচনে লড়াই নয়—
- দুই বার পঞ্চায়েত সমিতির সহ-সভাপতি,
- পরে সভাপতি,
- জেলা পরিষদেপূর্ত পূর্ত কর্মাধ্যক্ষর দায়িত্বে দীর্ঘদিন কাজ,
- পার্টির জোনাল কমিটির সম্পাদক,
- হুগলি জেলার জেলা সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য।
জাতীয় স্তরে পঞ্চায়েতি রাজ কার্যক্রমে তাঁর অবদান দেখে ভারত সরকার থেকে একটি বিশেষ স্মারকলিপি পান। জেলা পরিষদ থেকেও সম্মাননা দেওয়া হয়।
রাজনৈতিক বিপদের দিন: ১৯৭৫ সালে রাজ্য ছাড়তে বাধ্য
১৯৭৫ সালে রাজনৈতিক টানাপোড়েন ও মামলা-মোকদ্দমার চাপ বাড়লে তাঁকে রাজ্য ছেড়ে আসামে গা-ঢাকা দিতে হয়। সেখানে জীবিকা চালানোর জন্য বেকারিতে কাজ করেন। তৎকালীন সময়ে তাঁর নামে মামলা দায়ের হলেও প্রাক্তন সিপিআইএমে র সাংসদ শক্তিমোহন মালিকের দাদা লালমোহন মালিক তাঁকে আইনি জটিলতা থেকে রক্ষা করেন।
বর্তমান বাম রাজনীতির অবস্থা নিয়ে খোলামেলা মত
প্রবীণ বাম নেতা হয়েও মোজাম্মেল হোসেন দ্ব্যর্থহীন ভাষায় স্বীকার করেন—
“অনেক ত্রুটি-বিচ্যুতি, ভুল সিদ্ধান্তের জন্যই মানুষ বামফ্রন্টকে সরিয়ে দিয়েছে।”
পার্টির অভ্যন্তরে তাঁর বহু পরামর্শ গ্রহণ করা হয়নি বলেও ক্ষোভের সুর শোনা যায় তাঁর কথায়। তিনি মনে করেন—
- নেতৃত্বের কর্তৃত্ব নয়, মানুষের পাশে থাকা প্রয়োজন।
- শুধুমাত্র সভা-মিছিল নয়, দরিদ্র মানুষের দরজায় পৌঁছনোই প্রকৃত কাজ।
- বড় গাছের তলায় ছোট গাছ বাঁচতে না পারলে সংগঠনের ভবিষ্যত সংকট তৈরি হয়।
- মানুষের মন না জিতে ক্ষমতা জেতা অসম্ভব।
বর্তমান শাসক দল সম্পর্কেও তিনি অত্যন্ত কঠোর মন্তব্য করেন—
“এমন কোনও খারাপ কাজ নেই যে তারা করেনি। মানুষ সবই দেখছে।”
মাওবাদ প্রসঙ্গে স্পষ্ট অবস্থান
মাওবাদী হিংস্র রাজনীতি সম্পর্কে তাঁর বক্তব্য সোজাসাপটা—
“সাধারণ মানুষকে হত্যা করে কোনওদিন ভালো কিছু হয় না। সমাজে খারাপ বার্তা ছড়ায়।”
ধর্মীয় রাজনীতির বিরোধিতা
বাবরি মসজিদ শিলান্যাস প্রসঙ্গে তাঁর মন্তব্য—
“বাবর তো এ দেশের জন্য কিছু করেনি, তাহলে বাবরি মসজিদ কেন? ধর্মের নামে অশান্তি ছড়ানো উচিত নয়। শান্ত পরিবেশ যে কোনও মূল্যে বজায় রাখতে হবে।”
ভোটার তালিকা সংশোধন ও সমসাময়িক রাজনীতি
নতুন ভোটার তালিকা (SIR) প্রসঙ্গে তিনি বলেন—
“তালিকা অবশ্যই নির্ভুল হওয়া উচিত। মৃত মানুষ বা বাইরের দেশের মানুষের নাম কেন থাকবে? তবে আরও সময় নিয়ে সংশোধন করা দরকার ছিল।”
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এবং মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়—দু’জনকেই তিনি “সঠিক পথের রাজনীতিক নন” বলে মনে করেন।
সরকারি চাকরির প্রস্তাব বহুবার এলেও তিনি দল ও জনগণের কাজেই নিজেকে উৎসর্গ করেছেন। এখনো নিয়মিত মিছিলে-সভায় যোগ দেন। কিন্তু স্ত্রী ও দুই পুত্রের অকাল মৃত্যুর শোক আজও তাঁকে ভাঙচুর করে দেয়।
সবশেষে তিনি বলেন—
“সংগঠন যদি আন্তরিকভাবে বামফ্রন্টের সিদ্ধান্ত পালন করে, মানুষের পাশে থাকে—তবে বামফ্রন্টকে রুখে দেওয়ার ক্ষমতা কারোর নেই।”
সাধারণ মানুষের উদ্দেশ্যে তাঁর বার্তা—
“বিচারবুদ্ধি দিয়ে ভোট দিন। এ দেশের ভবিষ্যৎ আপনার হাতে।”

![]()

More Stories
আরামবাগ শহরজুড়ে বেহাল রাস্তা: গর্ত, পাথর উঠে বিপজ্জনক চলাচল—দুর্ঘটনার আশঙ্কা রামকৃষ্ণ সেতুর স্বাস্থ্য নিয়েও উদ্বেগ, মার্চের মধ্যে কাজ শেষের আশ্বাস পিডব্লিউডি-র
আরামবাগে টেরাকোটার প্রাচীন মন্দিরগুলি ধ্বংসের মুখে
খানাকুলের গর্ব প্রদীপ্ত বাগ: ডব্লিউবিসিএস উত্তীর্ণ হয়ে ডিএসপি পদে মনোনীত