February 4, 2026

জঙ্গলমহলে নিঃশব্দ পতন: ছাত্রশূন্য হোস্টেল, থমকে থাকা স্বপ্ন

বাঁকুড়ার রানিবাঁধ ব্লকে বন্ধ সহস্রাধিক আবাসিক কেন্দ্র, উঠছে একাধিক প্রশ্ন

সোমালিয়া ওয়েব নিউজঃ বাঁকুড়া জেলার রানিবাঁধ ব্লকের বিভিন্ন এলাকার হোস্টেল রুমের এই ছবিগুলি আজ এক করুণ বাস্তবতার সাক্ষ্য বহন করছে। একসময় যে ঘরগুলি ছাত্রছাত্রীদের কোলাহলে মুখর থাকত, আজ সেগুলি নীরব, পরিত্যক্ত এবং তালাবদ্ধ।
এই হোস্টেলগুলিতে তফশিলি ও আদিবাসী ছাত্রছাত্রীরা নিঃখরচায় থাকা, পড়াশোনা ও খাওয়ার সুযোগ পেত। এখান থেকেই তারা নিয়মিত স্কুলে যেত। শিক্ষার আলো পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যে গড়ে ওঠা এই আবাসিক ব্যবস্থাগুলি ছিল ‘গোড়া থেকে গড়ে তোলার সংগ্রাম’-এর বাস্তব উদাহরণ।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ২০১১ সালের পরেও দীর্ঘদিন এই প্রক্রিয়া বজায় ছিল। হোস্টেল নির্মাণ, সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য তৎকালীন সাংসদ ও বিধায়কদের তহবিলের বড় অংশ ব্যয় করা হতো।
এলাকার মানুষ ও সিপিআইএমের অভিযোগ, প্রয়াত বাম নেতা উপেন কিস্কু, বাসুদেব আচারিয়া সহ একাধিক এমএলএ ও এমপির উদ্যোগেই জঙ্গলমহলের প্রত্যন্ত এলাকায় এই হোস্টেলগুলির মাধ্যমে শিক্ষার পরিকাঠামো গড়ে উঠেছিল। পাহাড়, জঙ্গল ও দুর্গম এলাকায় বসবাসকারী আদিবাসী পরিবারের সন্তানদের স্কুলছুট হওয়া রুখতেই এই আবাসিক ব্যবস্থার গুরুত্ব ছিল অপরিসীম।

কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই ব্যবস্থার চেহারা বদলাতে শুরু করে। বামপন্থীরা সংসদ ও বিধানসভায় শূন্য হয়ে পড়ার পর, ধীরে ধীরে ফাঁকা হতে থাকে একের পর এক হোস্টেল।
রানিবাঁধ ব্লকের হলুদ কানালি, মালবেড়া, পুরান পানি, ডাবড়ী, অম্বিকা নগর, রুদ্র, ধানরা, বারিকুল, কেচেনদা শবর—এই সমস্ত এলাকার হোস্টেলগুলিতে ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা কমতে কমতে একসময় পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায় বহু আবাসিক কেন্দ্র।

আজ পরিস্থিতি এমন জায়গায় পৌঁছেছে যে, গোটা জঙ্গলমহল জুড়ে সহস্রাধিক হোস্টেল কার্যত বন্ধ। ঘর আছে, রান্নাঘর আছে, কোথাও কোথাও এখনও বিছানা ও ব্ল্যাকবোর্ড পড়ে আছে—কিন্তু নেই পড়ুয়া। অবকাঠামো দাঁড়িয়ে আছে, অথচ থেমে গেছে শিক্ষা।

এই হোস্টেলগুলি বন্ধ হয়ে যাওয়ার পেছনে প্রশাসনিক উদাসীনতা, বরাদ্দের অভাব নাকি পরিকল্পিত অবহেলা—তা নিয়ে উঠছে একাধিক প্রশ্ন।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, অনেক ক্ষেত্রেই হোস্টেল চালানোর জন্য নিয়মিত বরাদ্দ বন্ধ হয়ে গেছে, কোথাও কর্মী নেই, কোথাও খাবারের ব্যবস্থা নেই। ফলে অভিভাবকরা বাধ্য হয়ে সন্তানদের বাড়িতে ফিরিয়ে নিতে শুরু করেন। ফলস্বরূপ বেড়েছে স্কুলছুটের হার।

শিক্ষাবিদদের মতে, এই হোস্টেলগুলি বন্ধ হয়ে যাওয়া মানে শুধু কয়েকটি ভবনের পরিত্যক্ত হয়ে পড়া নয়—এর অর্থ পুরো একটি প্রজন্মের শিক্ষার সুযোগ সংকুচিত হয়ে যাওয়া। জঙ্গলমহলের আদিবাসী অধ্যুষিত এলাকায় যেখানে এখনও দারিদ্র্য, যোগাযোগের অভাব ও সামাজিক পিছিয়ে পড়া বড় সমস্যা, সেখানে আবাসিক শিক্ষাব্যবস্থা ভেঙে পড়া গভীর সংকেত বহন করছে।

এই পরিত্যক্ত ঘরগুলি আজ শুধুই ইট-সিমেন্টের কাঠামো নয়। এগুলি সাক্ষী এক সময়ের শিক্ষাভিত্তিক সামাজিক আন্দোলনের, যেখানে প্রান্তিক ছাত্রছাত্রীরা স্বপ্ন দেখার সুযোগ পেত।
আজ সেই ঘরগুলির নীরবতা প্রশ্ন তোলে—
জঙ্গলমহলে আদিবাসী শিক্ষার ভবিষ্যৎ কোন পথে?
বন্ধ হোস্টেলগুলি কি আবার খুলবে, নাকি এই নীরবতাই হয়ে উঠবে স্থায়ী?

Loading