পুরুলিয়ার গর্ব
সোমালিয়া ওয়েব নিউজঃ ঝুলিতে ডাক্তারি ডিগ্রি, গলায় স্টেথোস্কোপ। বেশভূষা দেখে আপাতদৃষ্টিতে তাঁকে সন্ন্যাসী বলেই মনে হয়। কিন্তু কাছে গেলে বোঝা যায়—তিনি কেবল সন্ন্যাসী নন, বিলেত ফেরত একসময়কার খ্যাতনামা কার্ডিওলজিস্ট। ইনি স্বামী নির্বানানন্দ মহারাজ। পুরুলিয়াবাসীর কাছে তিনি শুধু ‘মহারাজ’ নন, তিনি ‘ডাক্তার মহারাজ’।
প্রায় ২৯ বছর ধরে বিনামূল্যে চিকিৎসা পরিষেবা দিয়ে চলেছেন পুরুলিয়ার সাধারণ মানুষকে। হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ হয়েও শহুরে বিলাসী জীবন নয়—গ্রামবাংলার মানুষের পাশে দাঁড়ানোই তাঁর ব্রত।
স্বামী নির্বানানন্দ মহারাজ পুরুলিয়ারই ভূমিপুত্র। নডিহা জিমন্যাস্টিক ক্লাবের বিপরীতেই তাঁর পৈতৃক বাড়ি। ১৯৬৭ সালে আর জি কর মেডিক্যাল কলেজ থেকে এমবিবিএস পাশ করার পর তিনি দিল্লির উইলিংটন হাসপাতালে (বর্তমানে ড. রাম মনোহর লোহিয়া হাসপাতাল) এক বছর কর্মরত ছিলেন। এরপর ১৯৭০ সালে দেশের সর্বোচ্চ চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান এইমস (AIIMS) থেকে এমডি ডিগ্রি অর্জন করেন—কার্ডিওলজিতে বিশেষজ্ঞ হিসেবে।
কিছুদিন এইমস-এ কাজ করার পর তিনি চলে যান বোকারো স্টিল সিটিতে। সেখানে প্রাইভেট প্র্যাকটিস শুরু করেন এবং অল্প সময়ের মধ্যেই চিকিৎসক হিসেবে ব্যাপক খ্যাতি অর্জন করেন। এই সময়ের মধ্যেই তিনি চার বছরের জন্য বিদেশেও যান। দেশে ফিরে আবার প্র্যাকটিস শুরু করলে তাঁর নাম-ডাক আরও ছড়িয়ে পড়ে।
কিন্তু জীবনের মোড় ঘুরে যায় ১৯৮২ সালে। বোকারো স্টিল সিটিতে থাকাকালীন তিনি স্বামী ত্র্যক্ষরানন্দ মহারাজের সংস্পর্শে আসেন। সেই সময় থেকেই তাঁর মধ্যে গভীর আধ্যাত্মিক ভাবের বিকাশ ঘটে। তিনি উপলব্ধি করেন—অর্থ, খ্যাতি, সাফল্যের পরেও জীবনে কিছু অপূর্ণ থেকে যাচ্ছে।
আর জি কর মেডিক্যাল কলেজে পড়ার সময়ই তিনি একদিন প্রতিজ্ঞা করেছিলেন—ডাক্তার হওয়ার পর পুরুলিয়ার মানুষের সেবা করবেন। সেই প্রতিজ্ঞা পূরণ করতেই ১৯৯৬ সালে তিনি সব ছেড়ে ফিরে আসেন নিজের জন্মভূমিতে। সংসার জীবন ত্যাগ করে গ্রহণ করেন সন্ন্যাস।
তারপর থেকে আজও তিনি পুরুলিয়ার কেতিকা অঞ্চলে অবস্থিত রামকৃষ্ণ তারক মঠে প্রতিদিন সাধারণ মানুষের চিকিৎসা করে চলেছেন। তাঁর কাছে চিকিৎসার কোনও নির্দিষ্ট ফি নেই। যাঁরা গরিব—তাঁদের জন্য চিকিৎসা সম্পূর্ণ বিনামূল্যে। যাঁদের সামর্থ্য আছে, তাঁরা খুশি মনে যা প্রণামী দেন—সেটুকুই গ্রহণ করেন তিনি।
হিন্দু-মুসলিম, ধনী-গরিব—কোনও ভেদাভেদ নেই তাঁর কাছে। তাঁর কাছে একটাই পরিচয়—রোগী। হৃদরোগের মতো জটিল অসুখেও তিনি ধৈর্য ধরে রোগীর কথা শোনেন। অনেক সময় রোগীকে সঠিক জায়গায় পাঠিয়ে দেন, যাতে কেউ প্রতারিত না হয়।
এই দীর্ঘ সেবাযজ্ঞে তাঁর ছায়াসঙ্গী হয়ে পাশে থেকেছেন কানাইলাল দত্ত। প্রতিদিন রোগী দেখার কাজে তিনি নিয়মিতভাবে ডাক্তার মহারাজকে সহযোগিতা করেন।
আজ যখন চিকিৎসা ব্যবস্থা ক্রমশ বাণিজ্যিক হয়ে উঠছে, তখন স্বামী নির্বানানন্দ মহারাজ প্রমাণ করে দিচ্ছেন—চিকিৎসা আসলে একটি মানবিক ব্রত। ডিগ্রি, যন্ত্র, ওষুধের পাশাপাশি দরকার সহানুভূতি, সময় আর আন্তরিকতা।
পুরুলিয়ার মানুষ তাই তাঁকে শুধু একজন ডাক্তার হিসেবে নয়—একজন আশ্রয়, একজন ভরসা, একজন মানবিক আদর্শ হিসেবেই দেখেন।
প্রার্থনা—এই ‘ডাক্তার মহারাজ’ যেন আরও বহু বছর সুস্থ থেকে মানুষের সেবায় নিজেকে উৎসর্গ করে যেতে পারেন।

![]()

More Stories
কয়লা পাচার কাণ্ডে পশ্চিমবঙ্গে ইডির তল্লাশি অভিযান, দুর্গাপুর ও বুদবুদে হানা
দিল্লিতে রাজ্য পুলিশের বাড়তি টিম, ২২ জনের দল রাতের বিমানে রওনা
লোকভবনে রাজ্যপালের কাছে SIR সংক্রান্ত দাবিপত্র বিজেপি বিধায়কদের