গণশক্তি ৬০ বছরে

স্রোতের বিপরীতে অবিচল—মেহনতি মানুষের পক্ষে ছয় দশকের লড়াই

সোমালিয়া ওয়েব নিউজঃ আজ গণশক্তি পত্রিকার ৬০তম প্রতিষ্ঠা দিবস। ছয় দশক ধরে নিরবিচ্ছিন্নভাবে প্রকাশিত এই সংবাদপত্রটি শুধু একটি দৈনিক নয়—এটি মেহনতি মানুষের লড়াই, আন্দোলন ও স্বপ্নের কণ্ঠস্বর। কর্পোরেট প্রভাব ও ক্ষমতার চাপের বাইরে দাঁড়িয়ে মানুষের পক্ষে কথা বলার যে অঙ্গীকার নিয়ে গণশক্তির পথচলা শুরু হয়েছিল, ৬০ বছর পরেও সেই অঙ্গীকার অটুট।

প্রতিষ্ঠা দিবস উপলক্ষে কলকাতার প্রমোদ দাশগুপ্ত ভবনে বর্ষপূর্তি অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। অনুষ্ঠানের শুরু হয় অর্ক মুখার্জির সঙ্গীত পরিবেশনা এবং ভারতীয় গণনাট্য সঙ্ঘের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে। সভাপতিত্ব করেন প্রবীণ সিপিআই(এম) নেতা বিমান বসু। মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন সিপিআই(এম)-এর রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিম, পলিট ব্যুরো সদস্য শ্রীদীপ ভট্টাচার্য, সূর্য মিশ্র-সহ দলের শীর্ষ নেতৃত্ব।

অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে গণশক্তি পত্রিকার সম্পাদক শমীক লাহিড়ী বলেন,
“প্রতি মুহূর্তে বাধা, আক্রমণ ও প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে গত ৬০ বছর ধরে গণশক্তি চলছে। স্রোতের বিপরীতে হেঁটে কখনও আত্মসমর্পণ করিনি, লড়াই থেকে পিছিয়ে আসিনি। বহু সীমাবদ্ধতার মধ্যেও মানুষের সমর্থন নিয়েই আমরা এগিয়ে চলেছি।”

তিনি গত এক বছরে প্রয়াত গণশক্তির সাংবাদিক ও সংবাদকর্মীদের পাশাপাশি দেশের অন্যান্য সংবাদমাধ্যমের প্রয়াত কর্মীদের প্রতিও শ্রদ্ধা জানান।

উত্তাল সময়ের সাক্ষী গণশক্তি

১৯৬৭ সাল। উত্তাল রাজনৈতিক সময়। খাদ্য আন্দোলন, গণআন্দোলন, শাসকের দমন-পীড়ন—এই প্রেক্ষাপটেই ১৯৬৭ সালের ৩ জানুয়ারি গণশক্তি পত্রিকার আত্মপ্রকাশ। শুরুতে এটি ছিল একটি পাক্ষিক পত্রিকা। কর্পোরেট বা পুঁজিপতিদের প্রভাবমুক্ত থেকে শ্রমজীবী মানুষের কথা বলাই ছিল এর মূল লক্ষ্য।

১৯৬৯ সালের ডিসেম্বর থেকে গণশক্তি সান্ধ্য দৈনিক হিসেবে প্রকাশিত হতে শুরু করে। পরে পাঠক ও আন্দোলনের প্রয়োজন মেটাতে ১৯৮৬ সালের ১ মে (মে দিবস) থেকে এটি একটি পূর্ণাঙ্গ প্রভাতী দৈনিক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।

গণশক্তি পত্রিকার প্রতিষ্ঠা ও বিকাশের পেছনে যাঁদের অবদান অনস্বীকার্য, তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য—

  • মুজফ্‌ফর আহমদ (কাকাবাবু) — ভারতের কমিউনিস্ট আন্দোলনের পথিকৃৎ
  • প্রমোদ দাশগুপ্ত — সিপিআই(এম)-এর তৎকালীন রাজ্য সম্পাদক
  • সরোজ মুখোপাধ্যায় — দীর্ঘদিন সম্পাদক হিসেবে গণশক্তিকে আধুনিক সংবাদপত্রের রূপ দেন
  • অশোক গুপ্ত (রমেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য) — অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা

গণশক্তি শুরু থেকেই স্পষ্ট করে জানিয়েছিল—তারা তথাকথিত ‘নিরপেক্ষ’ নয়। তাদের অবস্থান ছিল স্পষ্ট ও ঘোষিত—

“আমরা নিরপেক্ষ নই, আমরা মেহনতি মানুষের পক্ষে।”

এই আদর্শই গণশক্তিকে আলাদা করেছে মূলধারার সংবাদমাধ্যম থেকে।

১৯৭২ থেকে ১৯৭৭—এই সময়কালে পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক অস্থিরতায় গণশক্তিকে একাধিকবার আক্রমণ, সেন্সর ও দমন-পীড়নের মুখে পড়তে হয়েছে। সাংবাদিকদের ওপর হামলা, কাগজ ছাপা বন্ধের চেষ্টা—সবকিছুর মধ্যেও গণশক্তি থেমে থাকেনি।

কখনও ঘোর অন্ধকারে, কখনও দুর্বার আন্দোলনের ঢেউয়ের মাথায়, আবার কখনও নতুন সমাজ গড়ার স্বপ্নে—গণশক্তি থেকেছে মেহনতি মানুষের পাশে। প্রতিদিন, প্রতি রাতে শ্রমজীবী মানুষের জীবনের স্পন্দন তুলে ধরাই ছিল তার কাজ।

৬০ বছরে পা রেখেও গণশক্তি তারুণ্যে টগবগে। বহু সীমাবদ্ধতার মধ্যেও মানুষের সমর্থন নিয়েই এগিয়ে চলার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন সম্পাদক ও নেতৃত্ব। উত্তাল সময়েও লড়াইয়ের ময়দানেই থাকার বার্তা দিয়েছে এই পত্রিকা।

ছয় দশক পেরিয়ে গণশক্তি আজও প্রমাণ করে—এটি কেবল একটি সংবাদপত্র নয়, এটি বামপন্থী গণআন্দোলনের এক গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার।

Loading