আরামবাগে ইটভাটা বন্ধের নেপথ্যে প্রশাসনিক জটিলতা ও নীতিগত বৈষম্যের অভিযোগ
সোমালিয়া ওয়েব নিউজঃ আরামবাগ মহকুমার ইটভাটা শিল্প আজ অস্তিত্ব সংকটে। একদিকে মাটির তীব্র অভাব, অন্যদিকে ভূমি দপ্তরের কঠোর ও বাস্তবতাবিবর্জিত নিয়ম—এই দুইয়ের চাপে ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে একের পর এক ইটভাটা। প্রশ্ন উঠছে, এই সংকট কি শুধুই পরিবেশ রক্ষার নামে প্রশাসনিক ব্যর্থতা, নাকি নীতিগত বৈষম্যের শিকার আরামবাগ?
এক সময় ৪০, এখন ১২: কার স্বার্থে এই পতন?
সরকারি হিসেব অনুযায়ী, এক দশক আগেও আরামবাগ মহকুমায় প্রায় ৪০টি ইটভাটা সক্রিয় ছিল। বর্তমানে চালু রয়েছে মাত্র ১২টি।
এই পতনের জন্য কি শুধুই প্রাকৃতিক কারণ দায়ী? নাকি প্রশাসনিক অনুমতির জটিলতা ইচ্ছাকৃতভাবে শিল্পটিকে ঠেলে দিচ্ছে বন্ধের পথে—তা নিয়েই উঠছে প্রশ্ন।
মাটি কাটায় ছাড় অন্য জেলায়, আরামবাগে নয় কেন?
ইটভাটা মালিকদের অভিযোগ,
মুর্শিদাবাদ, বসিরহাট, আসানসোল-সহ বহু জেলায় এখনও নির্দিষ্ট শর্তে মাটি কাটার অনুমোদন দেওয়া হচ্ছে। অথচ আরামবাগ মহকুমায় সেই অনুমতি কার্যত অচল।
তবে কি একই রাজ্যের মধ্যে ভূমি নীতিতে দ্বৈত মানদণ্ড চলছে?
এই প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর আজও মেলেনি প্রশাসনের তরফে।
জলাশয় শর্ত: পরিবেশ রক্ষা না প্রশাসনিক অচলাবস্থা?
সূত্র মারফত জানা যায় ভূমি দপ্তরের নিয়ম অনুযায়ী,
যে জমি থেকে মাটি কাটা হবে, সেখানে জলাশয় তৈরি বাধ্যতামূলক।
কিন্তু অনুসন্ধানে উঠে এসেছে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য—
- আরামবাগের মাটি ৬ ইঞ্চি থেকে ১ ফুট গভীরে গেলেই ইট তৈরির অযোগ্য
- জলাশয় তৈরির মতো গভীর খনন এখানে বাস্তবসম্মত নয়
- জমির মালিকরা স্থায়ীভাবে জমি হারানোর আশঙ্কায় জলাশয় করতে রাজি নন
ফলে প্রশ্ন উঠছে—
ভৌগোলিক বাস্তবতা না বুঝে তৈরি এই নিয়ম কি কার্যত একটি শিল্প ধ্বংসের হাতিয়ার হয়ে উঠছে?
স্থানীয় শিল্প বন্ধ, বাইরের ইটের দাপট—কার লাভ?
আরামবাগের ইটভাটা যেখানে প্রতি ১০০০ ইট ১২ হাজার টাকায় বিক্রি করত, সেখানে বাইরের জেলা থেকে আসা ইট বিক্রি হচ্ছে ১৩–১৪ হাজার টাকায়।
তবু সেগুলিই কিনতে বাধ্য হচ্ছেন সাধারণ মানুষ।
তাহলে প্রশ্ন—
- স্থানীয় উৎপাদন কমে গেলে কারা বাজার দখল করছে?
- বাইরের জেলার ইটভাটা কি এই সংকট থেকে আর্থিক লাভ তুলছে?
- প্রশাসনের নীরবতা কি এই বাজার দখলের পথ প্রশস্ত করছে?
শতাধিক শ্রমিকের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত
ইটভাটা শিল্পের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে যুক্ত—
- মাটি কাটার শ্রমিক
- ইট তৈরির কারিগর
- পরিবহণ ও লোডিং শ্রমিক
ইতিমধ্যেই বহু শ্রমিক কাজ হারিয়েছেন। বাকি ভাটাগুলি বন্ধ হলে শতাধিক পরিবার রুজি-রোজগারহীন হয়ে পড়বে।
গ্রামীণ অর্থনীতিতে এর প্রভাব কতটা ভয়াবহ হতে পারে, তা নিয়ে কোনও সমীক্ষা কি প্রশাসন করেছে?
প্রশাসনের দরজায় দরজায়, তবু সমাধান নেই
ইটভাটা অ্যাসোসিয়েশনের দাবি, একাধিকবার লিখিত ও মৌখিকভাবে প্রশাসনের কাছে বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে।
তবে এখনও পর্যন্ত—
- কোনও স্পষ্ট নীতিগত সিদ্ধান্ত নেই
- কোনও বিকল্প মাটি ব্যবস্থাপনার পরিকল্পনা নেই
- কোনও সময়সীমা নির্ধারিত হয়নি
প্রশ্ন উঠছে, তবে কি প্রশাসন ধীরে ধীরে এই শিল্পের মৃত্যু মেনে নিয়েছে?
আরামবাগ মহকুমার ইটভাটা শিল্প যখন অস্তিত্ব সংকটে, তখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—এই সমস্যার দায় কার? সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই আরামবাগের ভূমি রাজস্ব দপ্তরের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করা হয়েছিল। কিন্তু সেখানেও মিলল না কোনও স্পষ্ট উত্তর।
সংবাদ মাধ্যমের ক্যামেরার সামনে বক্তব্যে অনিচ্ছা
সংবাদ সংগ্রহের সময় আরামবাগ ভূমি রাজস্ব দপ্তর স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেন,
তারা ক্যামেরার সামনে কোনও বক্তব্য দিতে চান না।
আরামবাগ থেকে জেলা সদর চুঁচুড়ার দূরত্ব প্রায় ১০০ কিলোমিটার।
সাংবাদিক মহলের প্রশ্ন—একটি মহকুমার সমস্যা নিয়ে সেই মহকুমার সর্বোচ্চ ভূমি রাজস্ব আধিকারিক যদি কথা না বলেন তাহলে স্থানীয় সাংবাদিকদের পক্ষে ১০০ কিলোমিটার দূরে গিয়ে সাক্ষাৎকার নেওয়া আদৌ কতটা বাস্তবসম্মত?
সাংবাদিকদের মতে, এটি কার্যত তথ্যপ্রাপ্তির অধিকারকে অপ্রত্যক্ষভাবে বাধাগ্রস্ত করার শামিল।
দায় এড়ানোর সংস্কৃতি?
বিশেষজ্ঞ ও প্রশাসনিক পর্যবেক্ষকদের একাংশের মত,
এই ধরনের আচরণ নতুন নয়। তাঁদের মতে—নিজেদের চাকরি ও পদ সুরক্ষিত রাখা,ঊর্ধ্বতন মহলের চাপ এড়ানো,বিতর্কিত সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রকাশ্যে প্রশ্নের মুখোমুখি না হওয়া
এই সব কারণেই শ্রেণীর উচ্চপদস্থ আধিকারিকরা ক্যামেরার সামনে বক্তব্য এড়িয়ে চলার কৌশল নিচ্ছেন।
প্রশ্ন উঠছে,
যেখানে শতাধিক শ্রমিকের রুজি-রোজগার অনিশ্চিত, সেখানে প্রশাসনের এই নীরবতা কি দায়িত্বজ্ঞানহীনতারই নামান্তর নয়?
এই নীতিগত বৈষম্য নিয়ে প্রশ্ন তুলতে গেলে,
মহকুমা স্তরের আধিকারিক বলছেন—“জেলায় যান”
জেলা স্তরের আধিকারিকদের বক্তব্য পাওয়াই কঠিন
একদিকে প্রশাসনিক নীরবতা,
গণতন্ত্রে প্রশ্ন করার অধিকার
গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় প্রশাসনের কাজ—
- প্রশ্নের উত্তর দেওয়া
- নীতি ব্যাখ্যা করা
- জনগণের উদ্বেগ দূর করা
কিন্তু যখন প্রশ্ন তুলতেই বলা হয় “ক্যামেরার সামনে কোনও বক্তব্য দিতে চান না”,
তখন স্বাভাবিকভাবেই সন্দেহ দানা বাঁধে।
বিশেষজ্ঞদের মতে,
আরামবাগের ইটভাটা শিল্প পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেলে—
- বাইরের জেলার ইটের উপর সম্পূর্ণ নির্ভরতা বাড়বে
- নির্মাণ খরচ বেড়ে যাবে
- সাধারণ মানুষ ও ছোট নির্মাতারা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন
পরিবেশ রক্ষা অবশ্যই জরুরি। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়—
পরিবেশ রক্ষার নামে কি একটি সম্পূর্ণ স্থানীয় শিল্প ও শতাধিক মানুষের জীবিকা বলি দেওয়া হচ্ছে?
আরামবাগের ক্ষেত্রে কি আলাদা, বাস্তবসম্মত নীতি প্রয়োজন নয়?
আরামবাগের ইটভাটা শিল্প আজ শুধু মাটির সংকটে নয়,
প্রশাসনিক জবাবদিহির সংকটেও ভুগছে।
প্রশ্ন এখন একটাই—
প্রশাসন কি মুখ খুলবে?
নাকি ইটভাটার সঙ্গে সঙ্গে প্রশ্ন করার অধিকারও ধীরে ধীরে চাপা পড়ে যাবে?
এখন দেখার, প্রশাসন এই প্রশ্নগুলির উত্তর দেয় কি না—নাকি আরও কয়েকটি ইটভাটা নীরবে বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর বিষয়টি আলোচনায় আসবে।
![]()

More Stories
আরামবাগ শহরজুড়ে বেহাল রাস্তা: গর্ত, পাথর উঠে বিপজ্জনক চলাচল—দুর্ঘটনার আশঙ্কা রামকৃষ্ণ সেতুর স্বাস্থ্য নিয়েও উদ্বেগ, মার্চের মধ্যে কাজ শেষের আশ্বাস পিডব্লিউডি-র
আরামবাগে টেরাকোটার প্রাচীন মন্দিরগুলি ধ্বংসের মুখে
খানাকুলের গর্ব প্রদীপ্ত বাগ: ডব্লিউবিসিএস উত্তীর্ণ হয়ে ডিএসপি পদে মনোনীত