February 4, 2026

পৌষ মাসে টুসু বা তুসোলা ব্রত: গ্রামীণ বাংলার লোকসংস্কৃতির অনন্য ঐতিহ্য

সোমালিয়া ওয়েব নিউজ; পৌষ মাস এলেই গ্রামীণ বাংলার বিস্তীর্ণ অঞ্চলে শুরু হয়ে যায় টুসু বা তুসোলা ব্রত পালনের প্রস্তুতি। বিশেষ করে বাঁকুড়া, পুরুলিয়া, বীরভূম, ঝাড়গ্রাম ও পশ্চিম মেদিনীপুর, বর্ধমান ,  হুগলি প্রভৃতি জেলার গ্রামাঞ্চলে এই ব্রত আজও লোকসংস্কৃতির এক গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ হিসেবে পালিত হয়ে আসছে। কৃষিনির্ভর সমাজে শস্য ও সংসারের মঙ্গল কামনায় এই ব্রতের প্রচলন বহু প্রাচীন।

লোকবিশ্বাস অনুযায়ী, টুসু দেবী শস্য, সমৃদ্ধি ও নারীর আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতীক। সাধারণত অবিবাহিত কিশোরী ও যুবতীরা এই ব্রত পালন করে থাকলেও, অনেক এলাকায় বিবাহিত নারীরাও সংসারের সুখ ও শান্তির জন্য টুসু ব্রতে অংশ নেন। অগ্রহায়ণ সংক্রান্তি থেকে শুরু করে পৌষ সংক্রান্তি পর্যন্ত মাসব্যাপী এই উৎসব পালিত হয়, প্রায় এক মাস ধরে নিয়ম মেনে এই ব্রত পালিত হয়।

ব্রত উপলক্ষে মাটির বা কাঠের ছোট টুসু প্রতিমা বা পুতুল তৈরি করা হয়। অগ্রহায়ণ মাসের শেষ দিনে কুমারী মেয়েরা একটি মাটির সরায় তুষ (ধানের খোসা), ধান, গোবর এবং বিভিন্ন ফুল দিয়ে টুসু দেবীর প্রতীক প্রতিষ্ঠা করে। প্রতিদিন সন্ধ্যাবেলায় গ্রামের মেয়েরা একত্রিত হয়ে টুসু গান গেয়ে পূজা দেন। ফুল, ধান, দূর্বা, চাল, গুড় ও নানা ধরনের পিঠে টুসুর সামনে নিবেদন করা হয়। এই টুসু গানেই ফুটে ওঠে গ্রামীণ জীবনের সুখ-দুঃখ, প্রেম-বিরহ ও সামাজিক বাস্তবতার নানা চিত্র। পৌষ মাসের শেষ রাতকে বলা হয় ‘টুসু জাগরণ’। এই রাতে মেয়েরা ঘুমান না; সারারাত গান গেয়ে এবং গল্প করে টুসু দেবীকে আগলে রাখেন।

পৌষ সংক্রান্তির দিন বিশেষ আচার-অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে টুসু ব্রতের সমাপ্তি ঘটে। ওই দিন নদী, পুকুর বা জলাশয়ে টুসু প্রতিমা বিসর্জন দেওয়া হয়। অনেক এলাকায় এই উপলক্ষে ছোটখাটো মেলা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজনও করা হয়, যেখানে টুসু গান ও লোকনৃত্য বিশেষ আকর্ষণ হয়ে ওঠে। ব্রত পালনকারী কুমারী মেয়েরা ও অন্যান্য মহিলারা জানাচ্ছেন, টুসু বা তুসোলা ব্রত পালনের ক্ষেত্রে মূলত সরিষা ফুলের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে।

লোকসংস্কৃতি গবেষকদের মতে, টুসু ব্রত কেবল ধর্মীয় আচার নয়, বরং গ্রামীণ নারীদের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক আত্মপ্রকাশের এক গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। আধুনিকতার প্রভাব সত্ত্বেও আজও এই ব্রত গ্রামীণ বাংলার ঐতিহ্য ও লোকজ সংস্কৃতিকে বাঁচিয়ে রাখার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করে চলেছে।

Loading