February 16, 2026

আজ বিজ্ঞানী ডঃ মেঘনাদ সাহার প্রয়াণ দিবস

সোমালিয়া ওয়েব নিউজঃ বিশ্ববরেণ্য জ্যোতির্পদার্থ বিজ্ঞানী ডঃ মেঘনাদ সাহা-র প্রয়াণ দিবসে তাঁর অবদান গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা হয়। ভারতীয় বিজ্ঞানের ইতিহাসে তিনি এক অনন্য নাম, যাঁর গবেষণা জ্যোতির্পদার্থবিজ্ঞানের ক্ষেত্রে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছিল।

বিশ্ববরেণ্য ভারতীয় বাঙালি তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানী ও জ্যোতির্বিজ্ঞানী ডঃ মেঘনাদ সাহা (১৮৯৩–১৯৫৬) আধুনিক জ্যোতির্পদার্থবিজ্ঞানের অন্যতম পথিকৃৎ। ১৯২০ সালে তিনি তাপীয় আয়নীকরণ তত্ত্ব (thermal ionization theory) এবং বিখ্যাত ‘সাহা আয়নিকরণ সমীকরণ’ (Saha ionization equation) প্রবর্তন করেন, যা নক্ষত্রের বায়ুমণ্ডল ও বর্ণালী বিশ্লেষণে আজও অপরিহার্য।

১৮৯৩ সালের ৬ অক্টোবর তৎকালীন ঢাকা জেলার সেওরাতলীতে (বর্তমান বাংলাদেশ) তাঁর জন্ম। ব্রিটিশ ভারতের এই বিজ্ঞানী পরবর্তীকালে স্বাধীন ভারতের সংসদ সদস্য হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।

বিজ্ঞান গবেষণার প্রসারে তিনি কলকাতায় সাহা ইনস্টিটিউট অফ নিউক্লিয়ার ফিজিক্স প্রতিষ্ঠায় অগ্রণী ভূমিকা নেন (১৯৪৯–৫০), যা পরবর্তীকালে ভারতের অন্যতম প্রধান গবেষণা প্রতিষ্ঠান হয়ে ওঠে। এ ক্ষেত্রে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরুর সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ ছিল।

বিজ্ঞানচর্চার পাশাপাশি তিনি কুসংস্কার ও অন্ধবিশ্বাসের বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন এবং বিজ্ঞানভিত্তিক সমাজ গঠনের পক্ষে মত প্রকাশ করেন। তিনি রয়্যাল সোসাইটি-র ফেলো (FRS) নির্বাচিত হন—যা তাঁর আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির প্রমাণ।

মেঘনাথ সাহা শুধু একজন বিজ্ঞানী নন, তিনি ছিলেন দৃঢ়চেতা চিন্তাবিদ ও সক্রিয় রাজনীতিবিদ। জাতীয় পরিকল্পনা ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের প্রশ্নে তিনি শিল্পায়নের পক্ষে দৃঢ় মত প্রকাশ করেন এবং এ বিষয়ে তাঁর মতাদর্শের সঙ্গে মহাত্মা গান্ধী-র চরকা-খাদি ভিত্তিক ভাবনার পার্থক্য ছিল। একই কারণে তাঁর সঙ্গে জওহরলাল নেহরু-রও মতভেদ দেখা যায়।

দেশের নদী প্রকল্প ও পরিকল্পনা নিয়ে অস্পষ্টতা দেখেই তিনি সরাসরি সংসদে বিষয়টি তুলে ধরার সিদ্ধান্ত নেন। নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর বড়দা শরৎচন্দ্র বসু তাঁকে সংসদীয় রাজনীতিতে আসতে উৎসাহ দেন এবং তাঁর পরিকল্পনামূলক চিন্তাভাবনাকে দেশের ভবিষ্যতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন। ১৯৫২ সালে শরৎচন্দ্র বসুর মৃত্যুর পর তাঁর স্ত্রী বিভাবতী বসু-র অনুরোধে তিনি লোকসভা নির্বাচনে অংশ নেন। তিনি বিপ্লবী সমাজতন্ত্রী দল (RSP)-এর প্রার্থী হিসেবে কলকাতা উত্তর-পশ্চিম কেন্দ্র থেকে নির্বাচনে লড়ে জয়লাভ করেন। তাঁর মতে, ভারতের ভবিষ্যৎ উন্নয়নে বাস্তব পরিকল্পনা ও শিল্পায়ন রাজনৈতিক স্লোগানের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

ভারতীয় পঞ্জিকা সংস্কারে মেঘনাদ সাহা-র অবদান বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। শকাব্দের সঙ্গে ভারতীয় সংস্কৃতির গভীর সম্পর্ক বিবেচনা করে তিনি জাতীয় বর্ষপঞ্জি শকাব্দের ভিত্তিতে নির্ধারণের প্রস্তাব দেন।

১৯৫২ সালে বিভিন্ন অঞ্চলে ভিন্ন ও অবৈজ্ঞানিক পঞ্জিকার ব্যবহার সরকারি কাজে জটিলতা সৃষ্টি করায় ভারত সরকার পঞ্জিকা সংস্কারের উদ্যোগ নেয় এবং সাহাকে পঞ্জিকা সংস্কার কমিটির চেয়ারম্যান করা হয়। তাঁর নেতৃত্বে দেশজুড়ে প্রচলিত প্রায় ত্রিশটি পঞ্জিকা সংগ্রহ করে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে সংস্কার করা হয়, যাতে সারা দেশে একটি একক ও বৈজ্ঞানিক বর্ষপঞ্জি চালু করা সম্ভব হয়।

১৯৫৬ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি এই মহান বিজ্ঞানীর প্রয়াণ ঘটে। তাঁর গবেষণা ও চিন্তাধারা আজও বিজ্ঞানচর্চা ও শিক্ষার ক্ষেত্রে প্রেরণার উৎস হিসেবে সমানভাবে প্রাসঙ্গিক।

ডঃ সাহার উদ্ভাবিত ‘সাহা আয়নীকরণ সমীকরণ’ (Saha Ionization Equation) নক্ষত্রের বর্ণালিবিদ্যা বোঝার ক্ষেত্রে বিশ্বজুড়ে বৈজ্ঞানিক মহলে বিপ্লব ঘটায়। তাঁর গবেষণার ফলেই নক্ষত্রের তাপমাত্রা ও রাসায়নিক গঠন নির্ণয়ের পদ্ধতি আরও সুস্পষ্ট হয়।

বিজ্ঞানচর্চার পাশাপাশি তিনি ছিলেন সমাজমনস্ক চিন্তাবিদ ও শিক্ষাবিদ। ভারতের বিজ্ঞান শিক্ষা, গবেষণা পরিকাঠামো এবং পরিকল্পিত উন্নয়নের ক্ষেত্রেও তাঁর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। প্রয়াণ দিবসে দেশজুড়ে বিভিন্ন শিক্ষা ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানে তাঁর জীবন ও কর্মের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয় এবং নতুন প্রজন্মকে বিজ্ঞানচর্চায় অনুপ্রাণিত করার আহ্বান জানানো হয়।

Loading