সোমালিয়া ওয়েব নিউজঃ বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে এক অনন্য সৃষ্টি দুর্গেশনন্দিনী। আর সেই উপন্যাসের পাতায় যে শৈলেশ্বর শিব মন্দিরের উল্লেখ রয়েছে, তা আজও বাস্তবের মাটিতে দাঁড়িয়ে বহন করছে ইতিহাস, ঐতিহ্য ও লোকবিশ্বাসের গভীর ছাপ। সাহিত্যিক বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় তাঁর উপন্যাসের প্রথম খণ্ডের ষষ্ঠ পরিচ্ছেদে এই মন্দিরকে কেন্দ্র করে তিলোত্তমা ও বিমলার দুর্গে ফিরে আসার ঘটনার বর্ণনা দিয়েছেন, যা কাহিনির আবেগকে আরও গভীর করে তোলে। মন্দিরের দীর্ঘ ১০ বছরের পূজারী সঞ্জিব চক্রবর্তী জানান উপন্যাসে এই শৈলেশ্বর মন্দিরই ছিল তিলোত্তমা ও জগৎসিংহের প্রথম সাক্ষাতের গুরুত্বপূর্ণ স্থান। সাহিত্যিক কল্পনার সঙ্গে বাস্তব ইতিহাস যেন একসূত্রে গাঁথা হয়েছে এই মন্দিরকে ঘিরে। শৈলেশ্বর শিব মন্দিরটি অবস্থিত গড় মান্দারণ-এর কাছাকাছি, বর্তমান হুগলী জেলার গোঘাট থানার অন্তর্গত কাটালি গ্রামে। স্থানীয় ইতিহাসে জানা যায়, এটি ছিল শূররাজ বংশের কুলদেবতার আসন। কথিত আছে, মান্দারণের অধিপতি বীরেন্দ্র সিংহের কন্যা তিলোত্তমা ও তাঁর স্ত্রী বিমলা নিয়মিত এই মন্দিরে পূজা দিতে আসতেন। এলাকার ভোলানাথ দে বাবুদের মত প্রবীণদের মতে, একসময় এই মন্দির থেকে মান্দারণ দুর্গ পর্যন্ত একটি গোপন সুরঙ্গপথ ছিল, যাতায়াতের জন্য যা ব্যবহৃত হতো। আজ তার নিদর্শন খুব স্পষ্ট না হলেও স্থানীয়দের বিশ্বাস ও স্মৃতিতে সেই ইতিহাস এখনও জীবন্ত। মন্দিরটিকে ঘিরে রয়েছে নানা অলৌকিক বিশ্বাস। এখানের শিবলিঙ্গটি মাটি থেকে সম্পূর্ণভাবে উত্তোলন করা যায়নি—এমনটাই প্রচলিত ধারণা। অনেক ভক্তের বিশ্বাস, এই শিবক্ষেত্রে প্রার্থনা করলে দূরারোগ্য ব্যাধি সেরে যায় এবং মনস্কামনা পূর্ণ হয়। আশপাশে আরও শিবমন্দির থাকলেও বহু মানুষ বিশেষভাবে এই শৈলেশ্বর শিব মন্দিরকেই বেশি গুরুত্ব দেন। শিবরাত্রিতে এবং বিশেষ করে গাজন উৎসবের সময় এই মন্দির প্রাঙ্গণে ভক্তদের ঢল নামে। ঢাকের শব্দ, ধূপ-ধুনোর গন্ধ, ভক্তির সুর—সব মিলিয়ে তৈরি হয় এক আবেগঘন পরিবেশ। গ্রামবাসীদের কাছে এটি শুধু একটি ধর্মীয় স্থান নয়, বরং তাদের সংস্কৃতি, বিশ্বাস ও ইতিহাসের কেন্দ্রবিন্দু। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এখানে পুজো হয়ে আসছে। অনেক পরিবার এখনও মানত করে, বিশেষ দিনে এখানে এসে পুজো দেন। উৎসবের দিনগুলোয় মন্দির চত্বর যেন হয়ে ওঠে এক মিলনমেলা—যেখানে সাহিত্য, ইতিহাস ও লোকবিশ্বাস একসূত্রে বাঁধা পড়ে। সাহিত্য সম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের কলমে যেভাবে এই মন্দিরের উল্লেখ রয়েছে, তা শুধু কাহিনির অংশ নয়—বরং বাংলার এক জীবন্ত ঐতিহ্যের প্রতিফলন। সাহিত্য ও বাস্তবের এই মেলবন্ধন আজও মানুষকে টানে, মনে করিয়ে দেয় অতীতের গৌরবময় সময়ের কথা। শৈলেশ্বর শিব মন্দির তাই কেবল একটি পুজোর স্থান নয়—এটি ইতিহাস, বিশ্বাস ও আবেগে ভরা এক সাংস্কৃতিক স্মারক, ধারক ও বাহক যা আজও মানুষকে টেনে নিয়ে যায় অতীতের সেই দিনগুলোর কাছে, যেখানে ধর্ম, সাহিত্য আর লোকঐতিহ্য একসঙ্গে পথ চলেছে।


![]()

More Stories
জন্মদিনে শ্রদ্ধাঞ্জলি
প্রবাদপ্রতিম সাহিত্যিক আশাপূর্ণা দেবী
প্রশ্নে আটকে থাকা মানুষ আর পথ চলা সাধক