February 17, 2026

আজ ১৮ই ফেব্রুয়ারি, বাংলা কবিতার সেই কালজয়ী জাদুকর, ‘রূপসী বাংলার কবি’ জীবনানন্দ দাশের ১২৭তম জন্মজয়ন্তী।

সোমালিয়া ওয়েব নিউজঃ তাঁর লেখনী আমাদের শিখিয়েছে ধূসর পাণ্ডুলিপির বিষণ্নতা আর বনলতা সেনের সেই দুষ্প্রাপ্য শান্তি। বাংলার প্রতিটি ঘাস, শালিক আর ধানের গন্ধের মধ্যে তিনি আজও বেঁচে আছেন। কবিগুরুর ‘বিশ্বকবি’ আর নজরুলের ‘বিদ্রোহী’ সত্তার ভিড়ে জীবনানন্দ ছিলেন একদমই স্বতন্ত্র—শান্ত, গভীর এবং নিরাভরণ।

“বাংলার মুখ আমি দেখিয়াছি, তাই আমি পৃথিবীর রূপ খুঁঁজিতে যাই না আর; অন্ধকারে জেগে উঠে ডুমুরের গাছে চেয়ে দেখি ছাতার মতন বড়ো পাতাটির নিচে ব’সে আছে ভোরের দোয়েল পাখি—”

১৮৯৯ সালের আজকের এই দিনে (৬ই ফাল্গুন, ১৩০৫ বঙ্গাব্দ) তৎকালীন অবিভক্ত বাংলার বরিশালে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। আধুনিক বাংলা কবিতার মোড় পরিবর্তনকারী এই মহান কবির স্মরণে পশ্চিমবঙ্গসহ ওপার বাংলার বরিশালেও পালিত হচ্ছে নানা অনুষ্ঠান। আজ সকাল থেকেই কবির অনুরাগী ও সাহিত্যপ্রেমীরা বিভিন্ন স্থানে তাঁর প্রতিকৃতিতে মাল্যদান ও পুষ্পস্তবক অর্পণের মাধ্যমে শ্রদ্ধা নিবেদন করছেন। সামাজিক মাধ্যম থেকে শুরু করে সাহিত্য সভা—সর্বত্রই আজ প্রতিধ্বনিত হচ্ছে তাঁর কালজয়ী কবিতার পঙ্‌ক্তিমালা। বিশেষ করে ‘বনলতা সেন’, ‘আকাশলীনা’ এবং ‘বাংলার মুখ আমি দেখিয়াছি’-র মতো কবিতাগুলো আবৃত্তির মাধ্যমে তাঁর সৃষ্টিকে নতুন করে স্মরণ করা হচ্ছে। রবীন্দ্র-পরবর্তী বাংলা সাহিত্যে জীবনানন্দ দাশ ছিলেন এক অনন্য কণ্ঠস্বর। রবীন্দ্রপ্রভাব থেকে মুক্ত হয়ে তিনি বাংলা কবিতায় এক নতুন আধুনিকতা, পরাবাস্তবতা এবং গভীর নির্জনতার জন্ম দিয়েছিলেন। তাঁর কবিতায় বাংলার নিসর্গ—ধানসিঁড়ি নদী, শালিক, হিজল, বট আর ঘাসের গন্ধ এক অতিপ্রাকৃত রূপ নিয়ে ধরা দিয়েছে। বুদ্ধদেব বসু তাঁকে ‘নির্জনতম কবি’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছিলেন, যিনি লোকচক্ষুর অন্তরালে থেকেও বাংলা সাহিত্যের বাঁক বদলে দিয়েছিলেন।

এক নজরে জীবনানন্দের সাহিত্যকীর্তি

কবির জীবদ্দশায় মাত্র সাতটি কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হলেও, তাঁর মৃত্যুর পর আবিষ্কৃত হয়েছে অগণিত পাণ্ডুলিপি, যা বাংলা সাহিত্যের অমূল্য সম্পদ। তাঁর উল্লেখযোগ্য কিছু কাজ:

  • কাব্যগ্রন্থ: ঝরা পালক, ধূসর পাণ্ডুলিপি, বনলতা সেন, মহাপৃথিবী, সাতটি তারার তিমির, রূপসী বাংলা এবং বেলা অবেলা কালবেলা
  • উপন্যাস ও গল্প: মাল্যবান, সতীদাহ ইত্যাদি।
  • প্রবন্ধ: কবিতার কথা—যা বাংলা কাব্যতত্ত্বের এক আকর গ্রন্থ।

জীবনানন্দ দাশ কেবল একজন কবি ছিলেন না; তিনি ছিলেন সময়ের চেয়ে অগ্রবর্তী এক দার্শনিক। ‘তিমির হননের’ গান গেয়ে তিনি মানুষকে অন্ধকারের ওপারে আলোর পথ দেখাতে চেয়েছেন। আজ তাঁর জন্মদিনে তাঁর সেই অমোঘ বাণী—“সবাই কবি নয়, কেউ কেউ কবি”—আরও একবার মনে করিয়ে দেয় যে, তিনি ছিলেন সেই বিরল প্রতিভাদের একজন, যাঁদের সৃষ্টি কাল অতিক্রম করে চিরভাস্বর হয়ে থাকে।

Loading