অপারেশন সার্চলাইটে নির্বিচার গণহত্যা, শুরু হয় স্বাধীনতার রক্তাক্ত অধ্যায়
সোমালিয়া ওয়েব নিউজঃ গভীর শোক ও বেদনায় স্মরণ করা হচ্ছে ২৫ মার্চ, বাংলাদেশের ইতিহাসে এক বিভীষিকাময় রাত—‘কালরাত’। ১৯৭১ সালের এই দিনে মধ্যরাত নামার সঙ্গে সঙ্গে পাকিস্তান সেনাবাহিনী ‘Operation Searchlight’-এর মাধ্যমে নিরস্ত্র বাঙালির ওপর চালায় ইতিহাসের অন্যতম নৃশংস গণহত্যা।
রাতের অন্ধকারে ঢাকা সেনানিবাস থেকে ট্যাংক ও সাঁজোয়া যান নিয়ে শহরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে হামলা চালায় পাকিস্তানি বাহিনী। বিশেষ করে University of Dhaka-এর জগন্নাথ হল ও ইকবাল হল (বর্তমানে শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হল)-এ ছাত্রদের ওপর নির্বিচারে গুলি চালানো হয়। ঢাকা মেডিকেল কলেজ ছাত্রাবাস, রোকেয়া হল, এমনকি পাশের বস্তি এলাকাগুলিও এই হত্যাযজ্ঞ থেকে রক্ষা পায়নি।
পুরান ঢাকার হিন্দু অধ্যুষিত এলাকায় অগ্নিসংযোগ ও গণহত্যার পাশাপাশি হামলা চালানো হয় রাজারবাগ পুলিশ লাইনস এবং পিলখানায় তৎকালীন ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলসের সদর দপ্তরে। বাঙালি পুলিশ ও ইপিআর সদস্যরা প্রতিরোধের চেষ্টা করলেও ভারী অস্ত্রের মুখে তাদের পিছু হটতে হয়।
এই অভিযানের মূল লক্ষ্য ছিল পূর্ব পাকিস্তানে অবস্থানরত বাঙালি সামরিক ও আধাসামরিক বাহিনীকে নিরস্ত্র করা এবং Awami League-এর শীর্ষ নেতাদের গ্রেপ্তার করা। পাশাপাশি দেশজুড়ে কঠোর সামরিক আইন জারি, যোগাযোগব্যবস্থা ও গণমাধ্যমের ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা ছিল পরিকল্পনার অংশ।
গণহত্যার ভয়াবহতা উঠে আসে বিদেশি কূটনীতিক ও সাংবাদিকদের বয়ানেও। ঢাকায় তৎকালীন মার্কিন কনসাল জেনারেল Archer K. Blood ২৮ মার্চ পাঠানো এক বার্তায় এই ঘটনাকে ‘Selective Genocide’ বা বাছাই করা গণহত্যা হিসেবে উল্লেখ করেন।
অন্যদিকে, ব্রিটিশ সাংবাদিক Simon Dring-এর প্রতিবেদনে উঠে আসে সেই রাতের নির্মম চিত্র। তাঁর লেখা “Tanks Crush Revolt in Pakistan” শিরোনামের প্রতিবেদন ৩০ মার্চ প্রকাশিত হলে বিশ্ববাসী প্রথমবারের মতো এই হত্যাযজ্ঞের প্রকৃত চিত্র জানতে পারে। তিনি জানান, শুধু ঢাকাতেই সেদিন প্রায় ৭ হাজার মানুষ নিহত হয়েছিলেন বলে ধারণা করা হয়।
এই বর্বর অভিযানের নেপথ্যে ছিলেন পাকিস্তানের সামরিক জান্তার শীর্ষ কর্মকর্তারা। তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জেনারেল Agha Muhammad Yahya Khan, সেনাপ্রধান জেনারেল আবদুল হামিদ খান এবং পূর্বাঞ্চলের সামরিক কমান্ডার লেফটেন্যান্ট জেনারেল টিক্কা খানসহ আরও অনেকে সরাসরি এই পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের সঙ্গে জড়িত ছিলেন।
তবে এই নৃশংসতা বাঙালির স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষাকে দমিয়ে রাখতে পারেনি। বরং ২৫ মার্চ রাতেই চট্টগ্রামে অষ্টম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের বিদ্রোহের মাধ্যমে শুরু হয় সশস্ত্র প্রতিরোধ। এর মধ্য দিয়েই সূচনা হয় দীর্ঘ নয় মাসব্যাপী মুক্তিযুদ্ধের, যার ফলশ্রুতিতে জন্ম নেয় স্বাধীন বাংলাদেশ।
আজকের এই দিনে শহীদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়ে দেশবাসী স্মরণ করছে সেই সব নিরপরাধ মানুষকে, যাঁদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত হয়েছে স্বাধীনতা। ২৫ মার্চ তাই শুধু শোকের দিন নয়, বরং বাঙালির অদম্য সাহস ও আত্মত্যাগের এক চিরন্তন স্মারক।

![]()

More Stories
দিমোনায় ক্ষেপণাস্ত্র হামলার দাবি, পারমাণবিক কেন্দ্রে ক্ষয়ক্ষতির প্রমাণ নেই: IAEA
সন্ত্রাসবাদ বন্ধ না হলে সিন্ধু জল চুক্তি স্থগিতই থাকবে: ভারতের কড়া বার্তা পাকিস্তানকে
কিউবায় জ্বালানির সংকটে স্বাস্থ্যব্যবস্থা বিপর্যস্ত, মানবিক সঙ্কটের আশঙ্কা