সোমালিয়া ওয়েব নিউজ: ভারতীয় সেনাবাহিনী দীর্ঘদিন ধরে ব্রিটিশ আমলের নানা প্রতীক, রীতি ও পোশাকবিধি বহন করে এসেছে। স্বাধীনতার ৭৫ বছরেরও বেশি সময় পর সেনাবাহিনী এখন ধীরে ধীরে সেই ঔপনিবেশিক উত্তরাধিকার থেকে বেরিয়ে এসে ভারতীয় ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও আত্মনির্ভরতার ভিত্তিতে নতুন পরিচয় গড়ে তোলার উদ্যোগ নিয়েছে। সম্প্রতি সেনাবাহিনীর ইউনিফর্ম ও বিভিন্ন প্রতীকে যে পরিবর্তন আনা হয়েছে, তা শুধু পোশাক পরিবর্তনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি এক নতুন মানসিকতা, আত্মবিশ্বাস ও জাতীয় পরিচয়ের প্রতিফলন।
‘আর্মি ইউনিফর্ম–২০২৬’: নতুন যুগের সূচনাভারতীয় সেনাবাহিনী ‘Army Uniforms-2026’ কর্মসূচির মাধ্যমে ধাপে ধাপে নতুন পোশাকবিধি চালু করছে।
এই প্রকল্পের মূল লক্ষ্য হলো— ঔপনিবেশিক ধাঁচের পোশাক ও প্রতীকগুলির পুনর্মূল্যায়ন, ভারতীয় জলবায়ু ও যুদ্ধক্ষেত্রের বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ইউনিফর্ম তৈরি, সৈনিকদের আরাম, কার্যকারিতা ও পেশাদারিত্ব বৃদ্ধি, ‘আত্মনির্ভর ভারত’ কর্মসূচির আওতায় দেশীয় উৎপাদনকে উৎসাহিত করা।
সেনা সূত্রে জানা যায়, নতুন ইউনিফর্ম ডিজাইনের ক্ষেত্রে ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলের সামরিক ঐতিহ্য, আধুনিক প্রযুক্তি এবং আন্তর্জাতিক মানের সামরিক পোশাকের অভিজ্ঞতাকে বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে।
বন্দি জ্যাকেটের অন্তর্ভুক্তিসাম্প্রতিক পরিবর্তনের মধ্যে অন্যতম আলোচিত সংযোজন হলো ‘বন্দি জ্যাকেট’। এই জ্যাকেট ভারতীয় ঐতিহ্যের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। এটি দীর্ঘদিন ধরে কূটনৈতিক অনুষ্ঠান, রাষ্ট্রীয় সমাবেশ ও আনুষ্ঠানিক পোশাকের অংশ হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। সেনাবাহিনীর উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের নির্দিষ্ট আনুষ্ঠানিক অনুষ্ঠানে এই পোশাক ব্যবহারের সিদ্ধান্ত ভারতীয় সাংস্কৃতিক পরিচয়কে আরও সুস্পষ্ট করেছে।বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি শুধু পোশাকের পরিবর্তন নয়, বরং ভারতীয় সভ্যতা ও ঐতিহ্যের প্রতি সম্মানের বহিঃপ্রকাশ।
ঔপনিবেশিক প্রতীক অপসারণের উদ্যোগগত কয়েক বছরে ভারতীয় সেনাবাহিনী ও প্রতিরক্ষা মন্ত্রক একাধিক গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন করেছে।
১. রাজপথের নাম পরিবর্তননতুন দিল্লির ঐতিহাসিক ‘রাজপথ’-এর নাম পরিবর্তন করে ‘কর্তব্য পথ’ রাখা হয়েছে। এটি ব্রিটিশ শাসনের স্মৃতি থেকে বেরিয়ে এসে স্বাধীন ভারতের কর্তব্য ও দায়িত্ববোধকে তুলে ধরে।
২. নৌবাহিনীর নতুন পতাকাভারতীয় নৌবাহিনী তাদের পতাকা থেকে সেন্ট জর্জ ক্রস সরিয়ে ছত্রপতি শিবাজী মহারাজের ঐতিহ্য দ্বারা অনুপ্রাণিত নতুন প্রতীক গ্রহণ করেছে।
৩. সামরিক ঐতিহ্যের ভারতীয়করণবিভিন্ন সামরিক স্থাপনা, প্রশিক্ষণ কেন্দ্র এবং অনুষ্ঠানগুলিতে ভারতীয় বীর, রাজা-মহারাজা ও স্বাধীনতা সংগ্রামীদের ইতিহাসকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। নতুন কমব্যাট ইউনিফর্ম২০২২ সালে ভারতীয় সেনাবাহিনী নতুন ডিজিটাল কমব্যাট ইউনিফর্ম চালু করে।
এই ইউনিফর্মের বৈশিষ্ট্য—উন্নত ক্যামোফ্লাজ প্যাটার্ন, দ্রুত শুকিয়ে যাওয়া কাপড়, অধিক আরামদায়ক নকশা, বিভিন্ন আবহাওয়ায় কার্যকর ব্যবহার, অধিক টেকসই ও ব্যবহারবান্ধব উপাদান।নতুন ডিজাইনের ফলে জওয়ানদের যুদ্ধক্ষেত্রে কার্যক্ষমতা বৃদ্ধি পেয়েছে বলে সেনা কর্মকর্তারা মনে করেন।
‘আত্মনির্ভর ভারত’ ও প্রতিরক্ষা খাতসেনাবাহিনীর পোশাক সংস্কারের সঙ্গে আত্মনির্ভর ভারতের ধারণাও যুক্ত। বর্তমানে ভারত—দেশীয় প্রযুক্তিতে রাইফেল তৈরি করছে, নিজস্ব যুদ্ধবিমান ও হেলিকপ্টার উৎপাদন করছে, দেশীয় ড্রোন প্রযুক্তি ব্যবহার বাড়াচ্ছে, প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম রপ্তানিতেও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি করছে।এই প্রেক্ষাপটে সেনাবাহিনীর নতুন ইউনিফর্মও দেশীয় নকশা ও উৎপাদনের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে।
সাংস্কৃতিক আত্মবিশ্বাসের প্রতীকসামরিক বিশেষজ্ঞদের মতে, আধুনিক বিশ্বে একটি দেশের সেনাবাহিনী কেবল যুদ্ধক্ষমতার প্রতীক নয়; এটি জাতীয় পরিচয়েরও বাহক। যে কারণে— ফ্রান্স তাদের সামরিক ঐতিহ্যকে গুরুত্ব দেয়, জাপান নিজেদের সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য বজায় রাখে, ইসরায়েল জাতীয় পরিচয়ের সঙ্গে সামরিক ভাবধারাকে যুক্ত করে। ভারতও এখন একইভাবে নিজের ঐতিহ্য ও আধুনিকতার সমন্বয়ে নতুন সামরিক পরিচয় গড়ে তুলছে।
ভারতীয় সেনাবাহিনীর ইউনিফর্ম ও প্রতীকে সাম্প্রতিক পরিবর্তন কেবল বাহ্যিক রূপান্তর নয়; এটি একটি বৃহত্তর মানসিক ও সাংস্কৃতিক পরিবর্তনের প্রতিফলন। ব্রিটিশ আমলের প্রতীক থেকে সরে এসে ভারতীয় ঐতিহ্য, আত্মনির্ভরতা এবং জাতীয় গৌরবকে সামনে আনার এই উদ্যোগ স্বাধীন ভারতের আত্মবিশ্বাসী অভিযাত্রার অংশ। নতুন ইউনিফর্ম তাই শুধু পোশাক নয়—এটি এক শক্তিশালী, আধুনিক ও আত্মমর্যাদাসম্পন্ন ভারতের প্রতীক।

![]()

More Stories
পদ্মশ্রী সম্মানে ভূষিত বিশিষ্ট বিজ্ঞানী ড. কৃষ্ণমূর্তি বালসুব্রামনিয়ন
এশিয়ার প্রথম ‘হিউম্যান মিল্ক ব্যাংক’-এর প্রতিষ্ঠাতা পদ্মশ্রী ডা. আরমিদা ফার্নান্ডেজ
ইতিহাসের নতুন মাইলফলক: ভারতের দীর্ঘতম সময় ধরে দায়িত্ব পালনকারী নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী