সোমালিয়া ওয়েব নিউজ: আজ ১৩ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ। যদিও বাংলা পঞ্জিকা অনুযায়ী বর্তমানে শ্রাবণ মাস চলছে, তবুও হিন্দু তিথি অনুসারে আজ আষাঢ় মাসের পূর্ণিমা তিথি বিদ্যমান। সেই কারণেই আজ গুরু পূর্ণিমা বা ব্যাস পূর্ণিমা পালিত হচ্ছে। হিন্দু ধর্মে উৎসব ও ব্রত পালনের ক্ষেত্রে সৌর বা বাংলা মাসের তারিখের পরিবর্তে চন্দ্র তিথিকেই প্রাধান্য দেওয়া হয়। আষাঢ় মাসের পূর্ণিমা তিথি ভারতীয় সংস্কৃতি ও আধ্যাত্মিক পরম্পরায় এক বিশেষ দিন। এই দিনটি গুরু পূর্ণিমা নামে পরিচিত। গুরু পূর্ণিমা কেবল একটি ধর্মীয় উৎসব নয়, এটি জ্ঞান, শিক্ষা, নৈতিকতা এবং কৃতজ্ঞতার প্রতীক। ভারতীয় দর্শনে গুরু মানে কেবল শিক্ষক নন, যিনি অন্ধকার থেকে আলোয়, অজ্ঞান থেকে জ্ঞানের পথে নিয়ে যান, তিনিই গুরু। তাই এই দিনে গুরুর প্রতি শ্রদ্ধা, ভক্তি ও কৃতজ্ঞতা জানানো হয়।
প্রাচীন ভারতীয় সংস্কৃতিতে গুরু-শিষ্য সম্পর্ক ছিল শিক্ষার মূল ভিত্তি। গুরু শুধু বিদ্যা নয়, জীবনের আদর্শ, মূল্যবোধ এবং চরিত্র গঠনের শিক্ষাও দিতেন। সেই অবদানের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতেই গুরু পূর্ণিমা পালন করা হয়। এই দিনে শিষ্যরা তাঁদের গুরুকে প্রণাম করেন, আশীর্বাদ নেন এবং জীবনে তাঁর অবদানের কথা স্মরণ করেন।
হিন্দু ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, এই দিনেই মহর্ষি বেদব্যাস-এর জন্ম হয়েছিল। তিনি চারটি বেদের সংকলন, মহাভারত, আঠারোটি পুরাণ এবং ব্রহ্মসূত্র রচনার জন্য ভারতীয় জ্ঞানচর্চায় অনন্য অবদান রেখেছেন। তাই গুরু পূর্ণিমাকে ব্যাস পূর্ণিমা বলেও অভিহিত করা হয়। তাঁর স্মরণে এই দিন গুরুদের সম্মান জানানোর প্রথা প্রচলিত হয়েছে।
অন্যদিকে, বৌদ্ধ ধর্মমতে এই পূর্ণিমার দিনেই গৌতম বুদ্ধ সারনাথে তাঁর প্রথম ধর্মদেশনা প্রদান করেছিলেন। সেই কারণেও বৌদ্ধ সমাজে এই দিনের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে।
গুরু পূর্ণিমার দিন বিভিন্ন আশ্রম, মঠ, মন্দির এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বিশেষ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। গুরুর চরণে প্রণাম, পুষ্পার্ঘ্য নিবেদন, ধর্মীয় পাঠ, ভজন, আলোচনা সভা এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে দিনটি পালন করা হয়। অনেকে নিজের জীবনের শিক্ষক, পিতা মাতা,অভিভাবক বা পথপ্রদর্শকদের প্রতিও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।
গুরু পূর্ণিমা কোনো একটি ধর্ম, সম্প্রদায় বা পেশার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। যাঁরা জীবনে কারও কাছ থেকে শিক্ষা, দীক্ষা, অনুপ্রেরণা বা সঠিক পথের দিশা পেয়েছেন, তাঁদের সকলের কাছেই এই দিনটির গুরুত্ব রয়েছে।
এই দিন পালন করতে পারেন—
- ছাত্র-ছাত্রী
- শিক্ষক-শিক্ষিকা
- গবেষক ও শিক্ষাবিদ
- শিল্পী, সাহিত্যিক ও সংস্কৃতিকর্মীরা
- আধ্যাত্মিক সাধক ও ভক্তরা
- সাধারণ মানুষ, যাঁরা তাঁদের জীবনের পথপ্রদর্শকদের সম্মান জানাতে চান।
ভারতের শিক্ষা ও সংস্কৃতির ঐতিহ্যের সঙ্গে গুরু পূর্ণিমা গভীরভাবে জড়িত। তাই অনেকের মতে, বিদ্যালয়, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে দিনটি পালন করলে ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে শিক্ষক-শিক্ষিকার প্রতি শ্রদ্ধাবোধ, কৃতজ্ঞতা এবং নৈতিক মূল্যবোধ আরও দৃঢ় হতে পারে।
তবে এটি সাংস্কৃতিক ও শিক্ষামূলক কর্মসূচি হিসেবে পালন করা উচিত, যাতে সব ধর্ম ও সম্প্রদায়ের শিক্ষার্থীরা সমানভাবে অংশ নিতে পারেন এবং কেউ নিজেকে বিচ্ছিন্ন মনে না করেন। অনুষ্ঠানে গুরুর প্রতি শ্রদ্ধা, শিক্ষার মূল্য, আদর্শ জীবন এবং মানবিক মূল্যবোধ নিয়ে আলোচনা, প্রাক্তন শিক্ষকদের সম্মাননা কিংবা অনুপ্রেরণামূলক বক্তৃতার আয়োজন করা যেতে পারে।
গুরু পূর্ণিমা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, মানুষের জীবনে জ্ঞানই সবচেয়ে বড় শক্তি, আর সেই জ্ঞানের পথ দেখান গুরু। আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর যুগেও একজন শিক্ষকের অনুপ্রেরণা, মূল্যবোধের শিক্ষা এবং মানবিক দিকনির্দেশনার কোনো বিকল্প নেই। তাই গুরু পূর্ণিমা শুধুমাত্র একটি ধর্মীয় আচার নয়; এটি কৃতজ্ঞতা, সম্মান এবং জ্ঞানের প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর এক চিরন্তন ঐতিহ্য।

![]()

More Stories
আজ পণ্ডিত ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের তিরোধান দিবস: নবজাগরণের অগ্রদূতকে শ্রদ্ধার্ঘ্য
পরীক্ষামূলকভাবে বাজারে আসছে ১০ ও ২০ টাকার পলিমার নোট
সংস্কৃত ক্লাবের অভিনব উদ্যোগে জনপ্রিয় হচ্ছে সংস্কৃত ভাষা