September 19, 2026

বাঁশের কঞ্চির ছিপ থেকে আধুনিক চারা,রিল—বদলে গিয়েছে মাছ ধরার সরঞ্জামের দুনিয়া

সোমালিয়া ওয়েব নিউজ: একটা সময় ছিল, পুকুরপাড় কিংবা গ্রামের খাল-বিলের ধারে মাছ ধরতে খুব বেশি আয়োজনের প্রয়োজন হতো না। বাড়ির উঠোনে পড়ে থাকা বাঁশের কঞ্চি, এক টুকরো সুতো, ছোট্ট বড়শি আর সামান্য টোপ—এই ছিল মাছ ধরার মূল সম্বল। পাউরুটি, আটা কিংবা বাড়িতে তৈরি ভাতের টোপেই চলত মাছ ধরা। সময়ের সঙ্গে বদলেছে মানুষের জীবনযাত্রা, বদলেছে মাছ ধরার সরঞ্জামও। বাঁশের কঞ্চির সেই ছিপের জায়গা নিয়েছে ফাইবারের ফোল্ডিং ছিপ, চায়না হুইল বা রিল, নানা ধরনের বড়শি, কৃত্রিম টোপ এবং আধুনিক সরঞ্জাম।

এক সময় গ্রামবাংলায় নিজেরাই বাঁশের কঞ্চি কেটে, শুকিয়ে, তাতে সুতো ও বড়শি লাগিয়ে ছিপ তৈরি করে নিতেন মৎস্যশিকারিরা। টোপও ছিল ঘরের সহজলভ্য জিনিস। পাউরুটি ও আটা মেখে তৈরি টোপ ছিল অত্যন্ত পরিচিত। কোথাও কোথাও বোলতার টিপ বা লার্ভা এবং বিভিন্ন পোকামাকড়ও ব্যবহার করা হতো।

শুধু বড়শিতে টোপ লাগালেই হতো না। মাছকে নির্দিষ্ট জায়গায় টেনে আনতে ব্যবহার করা হতো চারা। গরম ভাতের সঙ্গে সরিষার খৈল ভেজে কিংবা গুঁড়ো করে মিশিয়ে তৈরি করা হতো সেই চারা। জলে চারা ফেলার পর তার গন্ধে আশপাশের মাছ নির্দিষ্ট জায়গায় আসত। তারপর শুরু হতো অপেক্ষা—কখন ফাতনা নড়বে, কখন বড়শিতে মাছ উঠবে।

কিন্তু সেই দিন অনেকটাই বদলে গিয়েছে। এখন গ্রামগঞ্জের বিভিন্ন হাট-বাজারে বসছে মাছ ধরার সরঞ্জামের দোকান। গোঘাটের মদিনা হাটে গিয়ে দেখা গেল, মাছ ধরার সরঞ্জাম ঘিরে এখনও মানুষের আগ্রহ রয়েছে। সেখানে কথা হয় মাছ ধরার সরঞ্জাম বিক্রেতা, কামারপুকুরের লাহা বাজারের বাসিন্দা সিরাজ শেখের সঙ্গে। ১২ বছর বয়স থেকে তিনি এই ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত। তিনি জানান, বাঁশের কঞ্চির তৈরি সাধারণ ছিপের পাশাপাশি এখন বিভিন্ন মাপ ও ধরনের ফাইবারের ফোল্ডিং ছিপ পাওয়া যায়। ছোট পুঁটি থেকে কাতলা, রুই কিংবা বড় মাছ—মাছের ধরন ও মাছ ধরার পদ্ধতি অনুযায়ী রয়েছে আলাদা সরঞ্জাম।

আধুনিক ছিপের সঙ্গে জনপ্রিয় হয়েছে চায়না হুইল বা রিল। এর সাহায্যে সুতো ছাড়া ও গুটিয়ে নেওয়া সহজ হয়। দূরে টোপ ফেলতে এবং বড় মাছ ছিপে উঠলে সুতো নিয়ন্ত্রণ করতেও সুবিধা হয়। ফলে অভিজ্ঞ মৎস্যশিকারিদের পাশাপাশি নতুন প্রজন্মের শখের মাছ ধরার লোকজনের মধ্যেও এই সরঞ্জামের চাহিদা রয়েছে।

 কথা হয় সামন্তখণ্ডের বাসিন্দা আর এক ব্যবসায়ী লক্ষণ সিংয়ের সঙ্গে। ৩৫ বছর ধরে তিনি এই ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত। তিনি জানান, শুধু ছিপ বা রিল নয়, বাজারে এখন পাওয়া যায় নানা ধরনের বড়শি। মাছের প্রজাতি, আকার এবং টোপের ধরন অনুযায়ী বড়শির আকারও বদলে যায়। ছোট মাছের জন্য ছোট বড়শি থেকে বড় মাছের জন্য শক্তিশালী বড়শি—সবই রয়েছে দোকানে।

মাছ ধরার কৌশল সম্পর্কেও অভিজ্ঞ এই ব্যবসায়ীরা। কোন মাছের জন্য কী ধরনের চারা তৈরি করতে হয়, কীভাবে তা ব্যবহার করতে হয় এবং কীভাবে সুতো রাখতে হয়—ক্রেতাদের অনেক সময় তা দেখিয়েও দেন তাঁরা।

সময়ের সঙ্গে বদল এসেছে মাছের চারাতেও। আগে ভাত, আটা, পাউরুটি কিংবা সরিষার খৈল দিয়ে বাড়িতেই চারা তৈরি করা হতো। এখন বাজারে পাওয়া যাচ্ছে প্যাকেটজাত ও বিভিন্ন ব্র্যান্ডের চারা। মাছ আকর্ষণের জন্য নানা উপাদান মিশিয়ে তৈরি এসব চারার প্রতিও মৎস্যশিকারিদের আগ্রহ রয়েছে।

দোকানগুলিতে ছিপ, ফাতনা, সুতো, জাল, হুক, রিল-সহ নানা সরঞ্জাম দেখা যায়। ছোট মাছের জন্য হালকা সরঞ্জাম, আবার বড় মাছের জন্য অপেক্ষাকৃত মোটা ও শক্তিশালী সুতো ব্যবহার করেন অনেকে। সাধারণ ফাতনার পাশাপাশি কোথাও এখনও ময়ূরের পালকের তৈরি ফাতনা ব্যবহার করতে দেখা যায়। আবার বড় মাছ ধরার ক্ষেত্রে প্লাস্টিকের বলকেও ফাতনার মতো ব্যবহার করা হয়।

এই ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত অনেকের কাছেই এটি শুধু দোকানদারি নয়, পারিবারিক পেশা। হাটের নির্দিষ্ট দিনে বিভিন্ন গ্রাম ও বাজারে ঘুরে তাঁরা মাছ ধরার সরঞ্জাম বিক্রি করেন। বর্ষাকাল, শীতকাল কিংবা ছুটির দিনে মাছ ধরার আগ্রহ বাড়লে দোকানগুলিতেও ভিড় বাড়ে।

মাছ ধরা আজও অনেকের কাছে শুধুমাত্র মাছ সংগ্রহের উপায় নয়, অবসর কাটানোর একটি জনপ্রিয় শখ। ভোরবেলা ছিপ নিয়ে পুকুরপাড়ে বসা, ফাতনার দিকে তাকিয়ে থাকা কিংবা দীর্ঘ অপেক্ষার পর হঠাৎ ছিপে মাছ ওঠার মুহূর্ত—এসবের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে গ্রামবাংলার বহু পুরনো স্মৃতি।

আধুনিক সরঞ্জাম সেই পুরনো দিনের সরলতাকে অনেকটাই বদলে দিয়েছে। তবুও হারিয়ে যায়নি মাছ ধরার আকর্ষণ। বাঁশের কঞ্চির ছিপের জায়গায় ফাইবারের ছিপ, ঘরে তৈরি টোপের জায়গায় প্যাকেটজাত চারা এলেও ফাতনা নড়ার অপেক্ষা আর মাছ ছিপে ওঠার উত্তেজনা আজও একই রয়ে গিয়েছে। সেই আকর্ষণকে কেন্দ্র করেই গ্রামবাংলার হাটে-বাজারে এখনও টিকে রয়েছে মাছ ধরার সরঞ্জামের ছোট ছোট ব্যবসা।

Loading