October 1, 2026

রেডিমেডের ভিড়ে ফিকে হচ্ছে দর্জির দোকানের আলো

সোমালিয়া ওয়েব নিউজ: পুজো মানেই নতুন জামা। আর একসময় নতুন জামা মানেই ছিল পাড়ার দর্জির দোকানে ব্যস্ততা। কাপড়ের দোকান থেকে পছন্দ করে ছিট কেনা, তারপর সেই কাপড় নিয়ে দর্জির কাছে হাজির হওয়া। বুক, কোমর, কাঁধ, হাতার মাপ নেওয়ার পর শুরু হত কাপড়ে চক দিয়ে দাগ কাটা, কাঁচির খচখচ শব্দ, সেলাই মেশিনের একটানা ঘরঘর আর গরম ইস্ত্রির শোঁ-শোঁ আওয়াজ। নতুন কাপড়ের গন্ধে ভরে থাকত দোকানের চারপাশ। সকাল থেকে রাত, কখনও রাত পেরিয়ে ভোর পর্যন্ত চলত কাজ।

দর্জির ভাষায়, সেই কাজকে বলা হত ‘জামা কাটা’ বা ‘প্যান্ট কাটা’। কেউ চাইতেন ঢিলেঢালা পোশাক, কেউ আবার শরীরের সঙ্গে একেবারে মেপে বসা ফিটিং। কারও পকেট বড়, কারও হাতা ছোট—ক্রেতার পছন্দ অনুযায়ী তৈরি হত পোশাক। তাই পুজোর নতুন জামা তখন শুধু কেনা হত না, তৈরি করা হত।

কিন্তু সময় বদলেছে। বদলেছে পোশাক কেনার অভ্যাসও।

আজ বড় শপিং মল, বাজার কিংবা ফুটপাত—সর্বত্র রেডিমেড পোশাকের বিপুল সম্ভার। পছন্দের রং, ডিজাইন ও মাপ মিললেই সঙ্গে সঙ্গে কেনা যায় জামা বা প্যান্ট। অপেক্ষা নেই, মাপ দেওয়ার ঝামেলাও নেই। তার উপর অনেক ক্ষেত্রেই রেডিমেড পোশাকের দাম দর্জির কাছে তৈরি করানোর তুলনায় কম।

বর্তমানে একটি ফুল প্যান্ট তৈরির মজুরি প্রায় ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা। শার্ট বা জামার ক্ষেত্রে মজুরি প্রায় ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা। এর সঙ্গে যোগ হয় কাপড়ের দাম। ফলে মোট খরচ অনেকটাই বেড়ে যায়। অন্যদিকে বাজার বা শপিং মলে তুলনামূলক কম দামে ভালো মানের তৈরি পোশাক পাওয়া যাচ্ছে। স্বাভাবিকভাবেই ক্রেতাদের একটা বড় অংশ এখন রেডিমেডের দিকে ঝুঁকছেন।

তবে দর্জির তৈরি পোশাকের চাহিদা একেবারে শেষ হয়ে যায়নি। কারণ নিজের মাপ অনুযায়ী নিখুঁত ফিটিং, পছন্দমতো কাপড়ের মান, রং ও নকশা বেছে নেওয়ার সুযোগ এখনও দর্জির পোশাককে আলাদা করে রাখে।

আরামবাগ গার্লস কলেজের অধ্যাপক আশীষ কুমার নায়েক দর্জির তৈরি পোশাকই বেশি পছন্দ করেন। তাঁর মতে, রেডিমেড পোশাক সবসময় শরীর অনুযায়ী ঠিকঠাক ফিটিং হয় না। পোশাক তৈরি করালে নিজের পছন্দমতো কাপড়ের মান বেছে নেওয়া যায় এবং মাপও নিজের মতো করে দেওয়া সম্ভব।

সুনন্দা পাত্র আবার রেডিমেড ও দর্জির তৈরি—দুই ধরনের পোশাকই ব্যবহার করেন। তাঁর কথায়, রেডিমেড পোশাক কম দামে পাওয়া যায় এবং সহজেই কেনা যায়। তবে তৈরি পোশাকের খরচ বেশি হলেও ফিটিং ভালো হয়। তাই তিনি ব্যক্তিগতভাবে তৈরি পোশাককেই বেশি পছন্দ করেন।

পরিবর্তনের প্রভাব শুধু দর্জির ব্যবসায় নয়, দক্ষ কারিগর তৈরির ক্ষেত্রেও পড়েছে। একসময় দর্জির দোকানে ছিট কাটার জন্য আলাদা দক্ষ কারিগর থাকতেন। কেউ ছিলেন ফিটিংয়ে পারদর্শী, কেউ সেলাইয়ে। শরীরের গড়ন বুঝে কাপড় কাটার সেই দক্ষতা তৈরি হত বছরের পর বছর অভিজ্ঞতায়। এখন সেই দক্ষ কারিগরের সংখ্যা কমছে। নতুন প্রজন্মের অনেকেই এই পেশায় আসতে চাইছেন না।

রেডিমেড পোশাকের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে না পেরে অনেক দর্জি নিজের দোকান ছেড়ে রেডিমেড পোশাক তৈরির কারখানায় কাজ করছেন। আরামবাগের প্রবীণ দর্জি মানিক চন্দ্র মেদ্দা, কাশীনাথ মণ্ডল এবং খোকনদা দর্জির কথাতেও উঠে এসেছে একই আক্ষেপ—দোকানে কাজ কমার অন্যতম কারণ রেডিমেড পোশাকের বাড়বাড়ন্ত।

ছিটের দোকানদার চঞ্চল কুণ্ডু ও মিরাজ খানও জানিয়েছেন, রেডিমেড পোশাকের কারণে তাঁদের বেচাকেনায় প্রভাব পড়েছে। আগে মানুষ কাপড় কিনে দর্জির কাছে নিয়ে যেতেন, এখন অনেকেই সরাসরি তৈরি পোশাক কিনে বাড়ি ফিরছেন। নদিয়া থেকে এসে ফুটপাতে রেডিমেড পোশাক বিক্রি করেন এস পাল। তাঁর বক্তব্য, কাপড় ও মজুরির খরচ বেশি হওয়ায় মানুষ এখন কম দামের রেডিমেড পোশাকের দিকে বেশি আগ্রহী।

তবু সন্ধ্যা নামলে কোনও কোনও পুরনো দর্জির দোকান থেকে এখনও ভেসে আসে সেলাই মেশিনের শব্দ। কোনও প্রবীণ কারিগর এখনও মাপের ফিতে হাতে নিয়ে কাপড়ে চক দিয়ে দাগ কাটেন। হয়তো অর্ডার কমেছে, ভিড় কমেছে, কিন্তু দক্ষতার সেই হাত এখনও থেমে যায়নি।

রেডিমেডের যুগ সময় বাঁচিয়েছে, অনেক ক্ষেত্রে খরচও কমিয়েছে। কিন্তু দর্জির হাতে তৈরি পোশাকের সঙ্গে জড়িয়ে আছে অন্য এক অনুভূতি—নিজের পছন্দ, নিজের মাপ, অপেক্ষা এবং স্মৃতি।

তাই পাড়ার দর্জির দোকানের ম্লান হয়ে আসা আলো শুধু একটি ব্যবসার সংকটের ছবি নয়। এর মধ্যে লুকিয়ে আছে বদলে যাওয়া পুজো, বদলে যাওয়া বাজার এবং হারিয়ে যেতে বসা এক পুরনো অভ্যাসের গল্প।

Loading