সোমালিয়া ওয়েব নিউজঃ ঋত্বিক ঘটক (৪ নভেম্বর ১৯২৫ – ৬ ফেব্রুয়ারি ১৯৭৬)—এক নাম, এক আন্দোলন, এক অস্বস্তি, এক সংগ্রাম। তাঁর জীবনের প্রতিটি অঙ্গনে ছিল বিদ্রোহ, ক্ষোভ, অভিমান এবং অদম্য সৃষ্টিশীলতার এক প্রবাহ। তিনি ছিলেন এক নিখাদ বামপন্থী, যিনি কখনো আপোষ করেননি, এককথায় “অবিক্রিত” থেকেছেন, এমনকি সে দাম ছিল না সমাজে। ঋত্বিকের খ্যাতি ছিল তাঁর নিজের শর্তে, অন্যের ধারায় নয়। তিনি কখনোই সংস্কৃতির কুরুচিপূর্ণ বা নির্মম ব্যবহারে মাথা নত করেননি, এবং চলচ্চিত্রে যে প্রতিবাদ, সংগ্রাম, এবং অন্যায্যতার বিরুদ্ধে তাঁর মনের ক্ষোভ ভেসে উঠেছিল, তা আজও অনুপ্রেরণার মতো গলা পেরিয়ে কানে আসে। ঋত্বিক ঘটক ছিলেন একপ্রকারের ‘বাঙালির ব্যথা’, যে ব্যথার মধ্যে ছিল দেশভাগ, বাঙালি চেতনা, এবং সর্বোপরি স্বাধীনতা সংগ্রাম। তাঁর ছবি ‘মেঘে ঢাকা তারা’, ‘সিদ্ধান্ত’, ‘কংকণী’, এসব ছবির মধ্য দিয়ে তিনি রচনা করেছিলেন সেই সময়ের এক অমলিন কাব্য, যা জাতির আড়ালে চাপা পড়া ক্ষতগুলো উন্মোচন করেছিল। তিনি ছিলেন সেই মহাপুরুষ, যিনি অন্যায্যতার বিরুদ্ধে প্রত্যক্ষ প্রতিবাদী ছিলেন, সমাজের শ্রেণী বৈষম্যের প্রতি তীব্র সমালোচক, কিন্তু নিজের গলায় কখনো আপোস করেননি। ঋত্বিকের নাম হয়ে উঠেছিল এক ধরনের আক্রমণ, প্রতিশোধ, প্রতিবাদ। মাতাল থাকাকালীন সময়ে যে কথাগুলো তিনি বলতেন, তা কেবল তার অস্থিরতাকেই প্রমাণ করে না, বরং তার মনের গভীরে লুকানো এক কঠোর বাস্তববাদী দর্শনকেও তুলে ধরে। বাংলা ভাগের পর, যিনি দেশভাগের অভিজ্ঞতাকে নিজের অস্তিত্বের ভিতর ধারণ করেছিলেন, তার জন্য সামাজিক-রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে কোনও আপোষ ছিল না। প্রতিটি ছবি ছিল তার প্রতিবাদী সত্তার একটা উজ্জ্বল প্রকাশ। তার শিল্পের সাথে কোনো রাজনৈতিক জ্ঞান ছিল না, বা বললে ভুল হবে, তিনি রাজনৈতিক রংধনুতে আটকে পড়েননি—তিনি ছিলেন এক বিক্ষুব্ধ চিন্তাবিদ, যে রাজনৈতিক মহলের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া সহ্য না করে, তার নির্মম সত্যের মধ্য দিয়ে সমাজের অন্ধকার দিকগুলোকে ধরতে চেয়েছেন। কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে তার সম্পর্কের খারাপ অবস্থা, তার দলিল নিয়ে ক্ষোভ, পার্টি থেকে বহিষ্কারের পরে তিনি যে আক্ষেপ করেছিলেন, তা তাঁর মনোভাবের এক অঙ্গ ছিল। তিনি নিজের পছন্দের শিল্পের প্রতি বিশ্বাসী ছিলেন, এবং কোনো চাপ তাকে তা ছেড়ে দেওয়া পর্যন্ত যেতে দেয়নি। ঋত্বিক ঘটকের অস্তিত্ব তাই তার কাজের মধ্যেই প্রতিধ্বনিত। যতটুকু সেই সমাজ এবং রাষ্ট্রের কাছে ছিল তাঁর ক্ষোভ, ঠিক ততটাই তাঁর কাজ মানুষের কল্যাণের জন্য, সমাজের দুঃখ-দুর্দশা বোঝানোর উদ্দেশ্যে। ঋত্বিক জানতেন, আজ হয়তো তাঁর কথা সবাই শুনবে না, তবে কাল তাঁকে আরও বেশি ভালোবাসা পাওয়া যাবে, তাঁকে আরও বেশি বুঝে নেওয়া হবে। এই ছিল তাঁর আত্মবিশ্বাস, এই ছিল তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি। আজও যখন আমাদের সমাজে শোষণ, অত্যাচার, বা কোনো ধরনের অনাচার ঘটছে, তখন ঋত্বিক ঘটকের কাজকে খোঁজে ফিরি। তাঁর চলচ্চিত্র, তাঁর বিশ্বাস, তাঁর বিদ্রোহ—এগুলোই আজও আমাদের বাঁচতে শিখায়, প্রতিবাদ করতে শেখায়, এবং সত্যের পথে অবিচল থাকতে শেখায়।
![]()

More Stories
‘ইতিহাস বইয়ে আকবর-ঔরঙ্গজেব, দেশের আসল নায়করাই ব্রাত্য’, সিলেবাস বদলের দাবি অক্ষয়ের?
বঙ্গোপসাগরের আকাশে ১৪,০০০ কিমি নো–ফ্লাই জোন ঘোষণায় ভারতের নিরাপত্তা কৌশলে নতুন অধ্যায়
বিহারে মাতৃদুগ্ধে ইউরেনিয়াম—চমকে দিল গবেষণাবিশেষজ্ঞদের সতর্কতা: দূষণ পৌঁছে গেছে বিপজ্জনক পর্যায়ে