গোঘাটের কাঁটালি গ্রামের সন্তান আজ রাষ্ট্রীয় স্তরের মঞ্চেও উজ্জ্বল
সোমালিয়া ওয়েব নিউজঃ শিক্ষা, গবেষণা, সমাজকল্যাণ, ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক চর্চায় এক অনন্য নাম ড. সুব্রত নায়েক,বয়স ৫ ৯ , হুগলী জেলার গোঘাট ব্লকের কাঁটালি গ্রামে সাধারণ মধ্যবিত্ত শিক্ষক পরিবারে জন্ম তাঁর,। পিতা শিবপ্রসাদ নায়েক ছিলেন একজন নিষ্ঠাবান স্কুল শিক্ষক এবং মাতা সতী নায়েক একজন গৃহবধূ। ছোটবেলা থেকেই শিক্ষার প্রতি আগ্রহ, সামাজিক কাজে অংশগ্রহণ এবং ক্রীড়ার প্রতি অনুরাগ—এই তিনেই গড়ে উঠেছিল তাঁর ভবিষ্যতের ভিত্তি।
একজন শিক্ষক কেবল বই শেখাবেন—এই ধারণা অতীত।
ড. নায়েকের কর্মকাণ্ড দেখায়—গ্রামবাংলায় শিক্ষকই হলেন প্রকৃত পরিবর্তনকারী শক্তি।
রক্তদান হোক, প্লাস্টিক বর্জন হোক, ডেঙ্গুর বিরুদ্ধে লোকসচেতনতা হোক, বা কন্যাশ্রী দিবসে ছাত্রছাত্রীদের উৎসাহিত করা—এই সব ক্ষেত্রেই তাঁর সক্রিয় উপস্থিতি প্রমাণ করে, একজন শিক্ষকের দায়িত্ব আসলে বহুস্তরীয়।
শুধু বিদ্যালয় পরিচালনা নয়—শিক্ষার মান উন্নয়ন, শিক্ষক–শিক্ষার্থীর সম্পর্ক মজবুত করা, গ্রামীণ শিক্ষায় বৈজ্ঞানিক মনোভাব গড়ে তোলা—এসবই তাঁর কাজের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
নিয়মিততা, শৃঙ্খলা, সৃজনশীলতা এবং মানবিকতার এমন সমন্বিত বিন্যাস আজ খুব কম শিক্ষকই দেখাতে পারেন।
১৯৯৪ সাল থেকে শুরু হওয়া তাঁর কর্মজীবন এখন শিক্ষার ক্ষেত্রের এক অনন্য অধ্যায়। অরুণাচল প্রদেশের পাহাড়ি প্রেক্ষাপট থেকে নিজের জেলার বিদ্যালয়ে ফিরে এসে তিনি যে দীর্ঘ সাড়ে তিন দশক কাটিয়েছেন, তা নিছক চাকরি নয়—এ এক সৃজনশীল সংগ্রাম।
ড. নায়েকের শিক্ষাগত যোগ্যতা যথেষ্ট বিস্তৃত ও বৈচিত্র্যময়। এম.এসসি (জুলজি)-এর পাশাপাশি এম.এড, এম.পি.এড এবং পি.এইচ.ডি ডিগ্রি অর্জন করে তিনি জ্ঞানচর্চার প্রতি নিজের প্রতিশ্রুতি প্রমাণ করেছেন।
শিক্ষকতা জীবনের সূচনা ১০ জানুয়ারি ১৯৯৪ সালে Government of Arunachal Pradesh-এ যোগদানের মাধ্যমে। পাহাড়ি অরুণাচলে তিনি প্রথম পেশাগত অভিজ্ঞতা সংগ্রহ করেন।
এরপর ১৩ নভেম্বর ১৯৯৫ সালে নিজের জেলার তিরোল হাই স্কুলে সহশিক্ষক হিসেবে যোগ দিয়ে স্থানীয় শিক্ষাব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত হন।
২০০৮ সালের ৪ জানুয়ারি থেকে আজ পর্যন্ত তিনি বেলাড় ভূরকুন্ডা হাই স্কুলের প্রধান শিক্ষক। তাঁর নেতৃত্বে বিদ্যালয়ে একাধিক আধুনিক উন্নয়নমূলক পরিবর্তন, শৃঙ্খলা ও পরিকাঠামোগত উন্নতি স্পষ্ট হয়েছে। স্কুলের ফলাফল, উপস্থিতি, ক্রীড়া ক্ষেত্র এবং সাংস্কৃতিক কার্যক্রম—সব দিকেই দৃশ্যমান উন্নতি ঘটেছে তাঁর সময়কালে। রণপায়ে তিনি যেমন পারদর্শী ঠিক তেমনি লাঠি খেলায়। রণপায়ে তিনি সমানভাবে নাচতেও পারেন।
ড. নায়েকের গবেষণার বিষয় ছিল—
“প্রাথমিক বিদ্যালয় স্তরে একাডেমিক সাফল্য, বুদ্ধিমত্তা স্তর ও শারীরিক কর্মক্ষমতার উপর প্রভাব”।
এই গবেষণা শিক্ষা–মনোবিজ্ঞান, শারীরিক শিক্ষাবিজ্ঞান ও প্রাথমিক শিক্ষার সংযোগস্থলে গুরুত্বপূর্ণ অবদান হিসেবে বিবেচিত।
এছাড়া তিনি রচনা করেছেন—
- পঞ্চম ও ষষ্ঠ শ্রেণির ওয়ার্ড বুক,
- জ্যামিতির পাঠ্যপুস্তক,
- বাংলা ব্যাকরণ ও রচনা বই (পঞ্চম থেকে অষ্টম শ্রেণি)।
এসব বই বহু বিদ্যালয়ের শিক্ষক–শিক্ষার্থীদের কাছে সহায়ক পাঠ্য হিসেবে স্বীকৃত।
ড. নায়েক শুধু শিক্ষকের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নন; তিনি গ্রাম ও ব্লকের সামাজিক উন্নয়নের ক্ষেত্রেও অগ্রণী।
স্বাস্থ্য ও মানবিক সেবামূলক উদ্যোগ
- রক্তদান শিবির আয়োজন
- সাধারণ মানুষের জন্য স্বাস্থ্য পরীক্ষা শিবির
- ডেঙ্গু ও ম্যালেরিয়া প্রতিরোধে প্রচারাভিযান
- থ্যালাসেমিয়া সচেতনতা
- প্লাস্টিক বর্জন ও পরিবেশবান্ধব জীবনযাপনের প্রচার
স্কুল ও সমাজে নিরাপত্তা ও সচেতনতা প্রচার
- সেভ ড্রাইভ সেভ লাইফ ক্যাম্প
- নির্মল বিদ্যালয় মিশনে হাত ধোয়া, পরিচ্ছন্ন শৌচাগার ব্যবহার নিয়ে শিক্ষামূলক কর্মসূচি
- ছাত্রছাত্রীদের দিয়ে দেয়ালে সামাজিক সচেতনতা চিত্র অঙ্কন
- স্কুলে দেয়াল পত্রিকা ‘আবহমান’ প্রকাশ
- বর্তমান সময়ে আত্মরক্ষার জন্য ছাত্রীদের শেখান লাঠি খেলা শিক্ষা।
সাংস্কৃতিক, ব্রতচারী ও ক্রীড়া চর্চায় নেতৃত্ব
- ব্রতচারী,লাঠি খেলা ,রণপা প্রশিক্ষণ শিবির আয়োজন ও পরিচালনা
- যোগাসন ও জিমন্যাস্টিক শিবিরের ব্যবস্থা
- স্থানীয় তরুণদের জন্য ক্রিকেট একাডেমি গঠন ও পরিচালনা
- ফুটবল রেফারির সার্টিফিকেট থাকার সুবাদে ব্লক ও জেলা স্তরে ম্যাচ পরিচালনার দায়িত্ব পালন
পরিবেশ রক্ষায় বিশেষ উদ্যোগ
- গ্রাম ও বিদ্যালয় স্তরে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি
- ছোট চারা বড় করে তারপর তা বিভিন্ন এলাকায় রোপণের বিশেষ পরিকল্পনা
- গোঘাট গ্রীণ ফোর্সের সহযোগিতায় প্রকৃতিনির্ভর উন্নয়ন
ড. নায়েকের অন্যতম উল্লেখযোগ্য উদ্যোগ হল—
অন্ধবিশ্বাস, কুসংস্কার, সর্পদংশন সংক্রান্ত ভুল ধারণা, বাল্যবিবাহ, নারী শিক্ষার অভাব ইত্যাদির বিরুদ্ধে সশক্ত সচেতনতা আন্দোলন।
- অডিও ও ভিডিও মাধ্যমে স্কুলে স্কুলে, গ্রামে গ্রামে প্রচার
- প্রাক্তন ছাত্র, অভিভাবক ও গ্রামবাসীদের একত্রিত করে বিজ্ঞানচেতনা ছড়িয়ে দেওয়া
- মেয়েদের উচ্চশিক্ষা ও বাল্যবিবাহ রোধে ধারাবাহিক কর্মসূচি
- সর্পদংশনের তাত্ক্ষণিক চিকিৎসা সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি
গ্রামাঞ্চলের সাধারণ মানুষের মধ্যে তাঁর উদ্যোগ ব্যাপক সাড়া ফেলেছে।
প্রাতিষ্ঠানিক পুরস্কার
- নির্মল বিদ্যালয় পুরস্কার
- ব্লক স্তরের নির্মল বাংলা পুরস্কার
- একাডেমিক এক্সেলেন্স অ্যাওয়ার্ড
- যুব সংঘ প্রতিযোগিতায় সেরা বিদ্যালয় পুরস্কার
- ওয়াই.পি.সি. স্ক্রিপ্ট রচনা ও পরিচালনার জন্য পুরস্কার
- জেলা স্তরের কলা উৎসবে সাফল্য
- কন্যাশ্রী দিবসে কুইজ, বক্তব্য, ছবি আঁকায় একাধিক পুরস্কার
ব্যক্তিগত সম্মাননা
- Best Teacher Award 2022 — InSc Institute of Scholar
- শিক্ষারত্ন সম্মাননা 2023 — পশ্চিমবঙ্গ সরকার
- জাতীয় শিক্ষক সম্মাননার জন্য পশ্চিমবঙ্গ সরকারের মনোনয়ন — 2023 ও 2024
শিক্ষাক্ষেত্রে তাঁর দীর্ঘদিনের নিষ্ঠা ও অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ এই সব সম্মান তাঁকে আরও অনুপ্রাণিত করেছে।
ড. সুব্রত নায়েক আজ গোঘাট অঞ্চলের শিক্ষাজগতের অন্যতম স্তম্ভ। একজন শিক্ষক হিসেবে যেমন তিনি দক্ষ ও মানবিক, তেমনই সমাজের প্রতি দায়িত্ববোধ, পরিবেশরক্ষা, স্বাস্থ্যসচেতনতা, সাংস্কৃতিক বিকাশ এবং ক্রীড়া চর্চায় তাঁর উদ্যোগ তাঁকে সাধারণ শিক্ষক থেকে অতুলনীয় জননেতৃত্বের পর্যায়ে নিয়ে গেছে।
আজ যখন সমাজ নানা সংকটে জর্জরিত—অন্ধবিশ্বাস, পরিবেশ বিপর্যয়, অশিক্ষা, বাল্যবিবাহ—সেই সময় একজন শিক্ষক যদি নীরব না থেকে এগিয়ে আসেন, তাহলে পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি হয়।
ড. সুব্রত নায়েক সেই সম্ভাবনার প্রতীক।
তিনি মনে করিয়ে দেন—
শিক্ষকতা শুধু পেশা নয়, এটি এক সামাজিক অঙ্গীকার।
গোঘাটের কাঁটালি গ্রাম তাঁর মতো শিক্ষকের জন্য গর্ব করতে পারে। বাংলার শিক্ষা–মানচিত্রেও তাঁর অবদান এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
এমন শিক্ষক যত বাড়বে, ততই গ্রামবাংলা নতুন আলোয় জেগে উঠবে।
একজন শিক্ষক কীভাবে সমাজের বহুস্তরে ইতিবাচক প্রভাব রাখতে পারেন—ড. সুব্রত নায়েক তারই প্রাণবন্ত উদাহরণ।






![]()

More Stories
আরামবাগ শহরজুড়ে বেহাল রাস্তা: গর্ত, পাথর উঠে বিপজ্জনক চলাচল—দুর্ঘটনার আশঙ্কা রামকৃষ্ণ সেতুর স্বাস্থ্য নিয়েও উদ্বেগ, মার্চের মধ্যে কাজ শেষের আশ্বাস পিডব্লিউডি-র
আরামবাগে টেরাকোটার প্রাচীন মন্দিরগুলি ধ্বংসের মুখে
খানাকুলের গর্ব প্রদীপ্ত বাগ: ডব্লিউবিসিএস উত্তীর্ণ হয়ে ডিএসপি পদে মনোনীত