February 4, 2026

গাছ কাটতে দালালের দরকার নেই:বনদপ্তরের সরাসরি অনুমতিতেই মিলছে পারমিশন, জানালেন আরামবাগ ফরেস্টে রেঞ্জ অফিসার

সোমালিয়া ওয়েব নিউজ; বেআইনিভাবে গাছ কাটার ভয়, আইনের জটিলতা এবং প্রশাসনিক প্রক্রিয়া সম্পর্কে অজ্ঞতার সুযোগ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই সক্রিয় এক শ্রেণীর দালালচক্র। গাছ কাটার পারমিশন করে দেওয়ার নাম করে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে হাজার হাজার টাকা আত্মসাৎ করার অভিযোগ নতুন নয়। শেষ পর্যন্ত দেখা যায়—পারমিশন মেলেনি, অথচ টাকা উধাও।

এই পরিস্থিতিতে গাছ কাটার প্রকৃত নিয়ম ও আইনি প্রক্রিয়া জানতে আরামবাগ ফরেস্টের রেঞ্জ অফিসার আশরাফুল ইসলাম-এর সঙ্গে কথা বলে উঠে এল একাধিক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য, যা কার্যত দালালচক্রের মুখোশ খুলে দিলেন।

দালাল নয়, সরাসরি বনদপ্তরই একমাত্র পথ

রেঞ্জ অফিসার আশরাফুল ইসলাম স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন,

গাছ কাটার পারমিশনের জন্য কোনও দালালের প্রয়োজন নেই।

সরাসরি সংশ্লিষ্ট বনদপ্তরে এসে আবেদন করলেই নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে খুব সহজেই অনুমতি পাওয়া যায়।

তিনি জানান—

* মাত্র কয়েকটি নির্দিষ্ট ফর্ম

* কিছু শর্ত ও নির্দেশাবলী

* নির্ধারিত ফিস জমা

এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন করলেই আইনসম্মতভাবে বৃক্ষছেদন করা যায়।

গাছ কোথায় আছে, তা বড় কথা নয়

অনেকের মধ্যে ভুল ধারণা রয়েছে যে,

শুধু সরকারি জমির গাছই বনদপ্তরের আওতায় পড়ে।

কিন্তু বাস্তব চিত্র একেবারেই আলাদা।

রেঞ্জ অফিসারের কথায়—“গাছ সরকারি জমিতে হোক বা ব্যক্তিগত মালিকানাধীন জমিতে—সব গাছই বনদপ্তরের আওতার মধ্যে পড়ে।”

শুধু গাছ নয়—বনজ প্রাণী, বনভূমি, এমনকি বনাঞ্চলের প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষাও বনদপ্তরের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে।

ভূমিক্ষয় ও বেআইনি মাটি কাটায় উদ্বেগ

নদীর গতিপথ পরিবর্তনের ফলে পাড় আদ্রা এলাকায় মারাত্মক ভূমিক্ষয় শুরু হয়েছে।

অভিযোগ উঠেছে—জঙ্গলের ভেতর থেকে বেআইনিভাবে মাটি কেটে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে,এর ফলে বনভূমি ও বহু গাছ ধ্বংস হচ্ছে।

বনদপ্তরের পক্ষ থেকে বিষয়টি সংশ্লিষ্ট দপ্তরকে একাধিকবার জানানো হলেও, কার্যকর সমাধান এখনও অধরা—যা প্রশাসনিক সমন্বয়ের অভাবকেই সামনে এনে দিচ্ছে।

ফরেস্টে গাছ নষ্ট হলে কী হয়?

ফরেস্ট এলাকায়—

* প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে গাছ ভেঙে পড়লে

* বা কোনওভাবে গাছ নষ্ট হলে

সেগুলি আলাদাভাবে দপ্তরে নিয়ে এসে—

* মূল্য নির্ধারণ করা হয়

* এরপর **ই-টেন্ডার পদ্ধতিতে নিলাম করা হয়।

বর্তমানে বনদপ্তরের প্রায় সমস্ত কাজই ডিজিটাল ও ই-টেন্ডার ভিত্তিক, ফলে স্বচ্ছতা অনেকটাই বেড়েছে বলে দাবি কর্তৃপক্ষের।

সবুজায়নের ফেরত: তিন বছরে বদলেছে চাঁদুর ফরেস্ট

এক সময় পিকনিকের চাপে চাঁদুর ফরেস্টের বিস্তীর্ণ এলাকা প্রায় মরুভূমির মতো হয়ে গিয়েছিল।

তবে—

* প্রায় তিন বছর পিকনিক বন্ধ রাখা

* নিয়মিত বৃক্ষরোপণ

এর ফলে আজ আবার চাঁদুর ফরেস্ট আগের তুলনায় অনেক বেশি ঘন ও সবুজ হয়ে উঠেছে।

ব্যক্তিগত জমিতে গাছ কাটার নিয়ম কী?

ব্যক্তিগত মালিকানাধীন জমিতে গাছ কাটার ক্ষেত্রে প্রয়োজন—

* নির্দিষ্ট আবেদন ফর্ম

* পঞ্চায়েতের অনুমতি

* জমি ও গাছের নথি

* সরকারি কোষাগারে মাত্র **২৫ টাকা ফিস জমা**

এই সমস্ত নথি জমা দিলে—

এক সপ্তাহের মধ্যেই পারমিশন পাওয়া সম্ভব**, জানিয়েছেন রেঞ্জ অফিসার।

**মেহগনি, শিশু গাছ কাটলে বাড়তি শর্ত**

মেহগনি, শিশু-সহ নির্দিষ্ট কিছু গাছ কাটার ক্ষেত্রে রয়েছে বিশেষ নিয়ম—

* একটি গাছ কাটলে **দুটি গাছ লাগানো বাধ্যতামূলক**

* প্রতি গাছের জন্য **৮০ টাকা করে সিকিউরিটি ডিপোজিট** জমা রাখতে হয়

দু’বছর পর যদি প্রমাণ করা যায় যে—

* কাটা গাছের দ্বিগুণ গাছ রোপণ করা হয়েছে

তাহলে ওই সিকিউরিটি ডিপোজিট ফেরত পাওয়া যায়।

দালালচক্রের ফাঁদ থেকে সাবধান

এই সমস্ত তথ্য সামনে আসার পর বড় প্রশ্ন—

যেখানে মাত্র ২৫ টাকায় সরকারি নিয়মে পারমিশন পাওয়া যায়,

সেখানে দালালরা কীভাবে হাজার হাজার টাকা নিচ্ছে?

বিশেষজ্ঞদের মতে—

আইন সম্পর্কে অজ্ঞতা ও ভয়ের সুযোগ নিয়েই এই দালালচক্র সক্রিয়।

গাছ কাটার ক্ষেত্রে আইন মানা যেমন জরুরি,

তেমনই জরুরি সঠিক তথ্য জানা।

বনদপ্তরের স্পষ্ট বার্তা—দালাল নয়, সরাসরি দপ্তরে আসুন।

আইন মেনে গাছ কাটুন, প্রকৃতি বাঁচান।

বনমহোৎসব থেকে বনসুরক্ষা:

গাছ, প্রাণী ও মানুষের সহাবস্থানে বাড়ছে চ্যালেঞ্জ—সচেতনতার ডাক বনদপ্তরের

বন সংরক্ষণ শুধু গাছ কাটা বা না কাটার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে বৃক্ষরোপণ, বন্যপ্রাণ সুরক্ষা, পরিবেশ ভারসাম্য এবং মানুষের সচেতন আচরণ। চাঁদুর ফরেস্টের রেঞ্জ অফিসার আশরাফুল ইসলামের সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনায় উঠে এসেছে এমনই একাধিক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য, যা সাধারণ মানুষের অজানাই থেকে যায়।

বিনা পয়সায় গাছের চারা— গাছ লাগাবেন?

প্রতিবছর জুলাই মাসের ১৪ থেকে ২০ তারিখ পর্যন্ত বনমহোৎসব উপলক্ষে বনদপ্তরের পক্ষ থেকে বিনা মূল্যে গাছের চারা বিতরণ করা হয়।

কিন্তু রেঞ্জ অফিসারের সতর্কবার্তা—

সব গাছ পরিবেশবান্ধব নয়।

তিনি জানান,

* **ইউক্যালিপটাস গাছের পাতা ও শিকড় মাটির পক্ষে ক্ষতিকারক**

* **ইউক্যালিপটাস ও সোনাঝুরি গাছ মাটিকে ধীরে ধীরে অনুর্বর করে তোলে**

অর্থাৎ, না বুঝে গাছ লাগালেই পরিবেশ রক্ষা হয় না—

সঠিক গাছ নির্বাচন করাই আসল চ্যালেঞ্জ।

বন কমছে, লোকালয়ে বাড়ছে বন্যপ্রাণ।

বনাঞ্চল সংকুচিত হওয়ায় এবং খাবারের অভাবে—

* **সাপ ও শেয়ালের সংখ্যা আগের তুলনায় বেড়েছে**

* বিশেষ করে **শেয়াল এখন লোকালয়ে ঢুকে পড়ছে**

বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি প্রকৃতির প্রতিশোধ নয়,

বরং মানুষের অপরিকল্পিত হস্তক্ষেপের ফল।

সাপ নিয়ে ভয় নয়, চাই সচেতনতা

রেঞ্জ অফিসার আশরাফুল ইসলাম জানান—

* অধিকাংশ সাপ **ডিম পাড়ে**

* কিন্তু **চন্দ্রবোড়া (Russell’s viper)** সরাসরি বাচ্চা দেয়

* একবারে **৫০ থেকে ৬০টি বাচ্চার জন্ম দিতে পারে**

এই কারণেই চন্দ্রবোড়া এলাকায় ঢুকলে ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়।

তিনি স্পষ্টভাবে বলেন—

“সচেতন না থাকলে রক্ষা পাওয়ার কোনও উপায় নেই।”

সাপ থেকে বাঁচতে কী করবেন?

বনদপ্তরের পরামর্শ অনুযায়ী—

* বাড়ির ভেতর ও আশপাশ **পরিষ্কার রাখতে হবে**

* নিয়মিত **ব্লিচিং পাউডার ব্যবহার করা যেতে পারে**

* রাতে ঘুমানোর সময় **অবশ্যই মশারির ভেতরে ঘুমাতে হবে**

* অন্ধকারে খালি পায়ে হাঁটা এড়িয়ে চলতে হবে

টিয়া-ময়না পোষা বেআইনি—তবু চলছে রমরমা ব্যবসা

আইন অনুযায়ী—

**টিয়া, ময়না-সহ বহু দেশীয় পাখি ধরা, কেনাবেচা বা পোষা সম্পূর্ণ বেআইনি।

তবুও অভিযোগ—

এক শ্রেণীর অসাধু ব্যবসায়ী এই কাজ চালিয়ে যাচ্ছে।

বনদপ্তর জানাচ্ছে—

* হাটে-বাজারে বিক্রি হওয়া পাখির উপর নিয়মিত নজরদারি চলে

* বহু ক্ষেত্রে পাখি উদ্ধারও করা হয়

পাখি বা প্রাণী কিনলে কী করবেন?

যেসব প্রাণী বা পাখি আইনসম্মতভাবে কেনাবেচার আওতায় পড়ে—

* **অবশ্যই সার্টিফিকেট নিতে হবে।

* **মালিকানা পরিবর্তনের নথি সংগ্রহ করতে হবে।

নথি ছাড়া পাখি বা প্রাণী রাখা মানেই—

আইনভঙ্গের ঝুঁকি।

তথ্য দিন, বন বাঁচান

বনদপ্তরের স্পষ্ট বার্তা—

* কোথাও বেআইনি গাছ কাটা

* বন্যপ্রাণ পাচার

* বনভূমি ধ্বংস

* বা সন্দেহজনক কোনও তথ্য থাকলে

সরাসরি বনদপ্তরে ফোন করে জানানো যেতে পারে —-03323340234, dfohowrah@gmail.com, চাঁদুর ফরেস্ট 7001836930

বন বাঁচাতে শুধু আইন নয়,

প্রয়োজন সচেতন নাগরিক।

গাছ কাটার আগে যেমন অনুমতি দরকার,

তেমনই গাছ লাগানোর ক্ষেত্রেও দরকার জ্ঞান।

বনদপ্তরের আহ্বান—

প্রকৃতি রক্ষা একদিনের কাজ নয়, এটি প্রতিদিনের দায়িত্ব।

Loading