বিষে ভেজা তেল, অবশ হয়ে যাওয়া জীবন, ভোজ্যতেল উৎপাদনের পদ্ধতি: লাভ, প্রযুক্তি ও জনস্বাস্থ্যের প্রশ্ন
১৯৮৭-র বেহালা সরষের তেল কাণ্ড: কলকাতার এক ভয়াল স্মৃতি
সোমালিয়া ওয়েব নিউজঃ ১৯৮৭ সাল। দক্ষিণ কলকাতার বেহালা ও আশপাশের এলাকায় হঠাৎ করেই শুরু হয় এক অদ্ভুত ও আতঙ্কজনক ঘটনা। একের পর এক মানুষ অসুস্থ হয়ে পড়তে থাকেন। প্রথমে বিষয়টিকে বিচ্ছিন্ন অসুস্থতা বলেই মনে হচ্ছিল। কিন্তু কয়েক দিনের মধ্যেই স্পষ্ট হয়ে যায়—এটা কোনো সাধারণ রোগ নয়।
কারও পায়ে ঝিনঝিন ভাব, কারও হাঁটতে অসুবিধা, আবার কারও শরীরের নিচের অংশ ধীরে ধীরে অবশ হয়ে যাচ্ছে। প্রতিদিনই একই ধরনের উপসর্গ নিয়ে বহু মানুষ হাসপাতালে ভিড় জমাচ্ছিলেন। চিকিৎসকরাও তখন বিভ্রান্ত—এত অল্প সময়ে এত মানুষ কীভাবে একই সমস্যায় আক্রান্ত হচ্ছেন, তার কোনও স্পষ্ট ব্যাখ্যা মিলছিল না।
এলাকাজুড়ে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। কিন্তু রোগের উৎস তখনও অজানাই থেকে যায়।
তদন্তে উঠে আসে ভয়ংকর সত্য
সরকারি তদন্ত শুরু হতেই ধীরে ধীরে সামনে আসে এক ভয়াবহ সত্য। দেখা যায়, আক্রান্ত পরিবারগুলোর প্রায় সবাই একই উৎস থেকে কেনা সরষের তেল ব্যবহার করছিলেন। পরীক্ষা করে জানা যায়, সেই তেল আদৌ খাঁটি সরষের তেল ছিল না।
তেলের সঙ্গে মেশানো হয়েছিল Tri-ortho-cresyl phosphate (TCP)—এক ধরনের শিল্পে ব্যবহৃত অত্যন্ত বিষাক্ত রাসায়নিক। এই রাসায়নিক সরাসরি মানুষের স্নায়ুতন্ত্রে আঘাত করে। নিয়মিত এই তেল ব্যবহার করার ফলে শরীরে ধীরে ধীরে নার্ভ ড্যামেজ শুরু হয়। মানুষের পেশি ও স্নায়ু নিজের স্বাভাবিক নিয়ন্ত্রণ হারাতে থাকে, যার ফল ভয়াবহ।
সরকারি হিসাবেই ১,৬০০ আক্রান্ত
সরকারি নথি অনুযায়ী, বেহালা সরষের তেল কাণ্ডে প্রায় ১,৬০০ জন মানুষ গুরুতরভাবে অসুস্থ হয়েছিলেন। অন্তত ১৮ জনের মৃত্যুর ঘটনা নিশ্চিতভাবে নথিভুক্ত হয়েছিল। বাস্তবে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ আরও বেশি ছিল বলেই মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।
এই ঘটনার সবচেয়ে মর্মান্তিক দিক হল—অনেক আক্রান্ত ব্যক্তি কখনও পুরোপুরি সুস্থ হতে পারেননি। কেউ কেউ সারাজীবনের জন্য পঙ্গু হয়ে যান, কারও চলাফেরার ক্ষমতা স্থায়ীভাবে নষ্ট হয়ে যায়। বহু পরিবার এমন এক শারীরিক ও মানসিক বিপর্যয়ের মুখে পড়ে, যেখান থেকে আর স্বাভাবিক জীবনে ফেরা সম্ভব হয়নি।১৯৮৭ সালের এই ঘটনা শুধুই একটি খাদ্য ভেজাল কাণ্ড নয়, এটি কলকাতার ইতিহাসে জনস্বাস্থ্যের এক ভয়ংকর অধ্যায়। বেহালা ও আশপাশের এলাকার বহু পরিবার আজও সেই দুঃসহ স্মৃতি বয়ে বেড়ান—একটি নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্য কীভাবে মুহূর্তে জীবনকে বদলে দিতে পারে, তার জলজ্যান্ত প্রমাণ হয়ে আছে এই ঘটনা।
এই সরষের তেল কাণ্ড আজও বারবার মনে করিয়ে দেয়—খাদ্যে ভেজাল শুধু অপরাধ নয়, তা এক একটি পরিবারের ভবিষ্যৎ ধ্বংস করে দিতে পারে।
বাজারে কমদামি সরিষার তেলের ছড়াছড়ি। ব্যস্ত জীবনে সময় আর অর্থ বাঁচাতে অনেকেই এখন আর শুদ্ধ খাবারের দিকে বিশেষ নজর দেন না। ফলে বাজারচলতি বোতলবন্দি তেলই হয়ে উঠেছে দৈনন্দিন রান্নার ভরসা। কিন্তু প্রশ্ন উঠছে—যে দামে বাজারে সরিষার তেল বিক্রি হচ্ছে, সেই দামে কি আদৌ আসল সরিষা দানা থেকে সম্পূর্ণ বিশুদ্ধ তেল উৎপাদন সম্ভব? অনেকেরই অভিযোগ, কমদামি সরিষার তেলের বড় অংশেই ভেজালের আশঙ্কা থাকে। রং ও ঝাঁঝ বাড়ানোর জন্য নানা ক্ষতিকর কেমিক্যাল মেশানো হয় বলে দাবি। এরপর আরও “শুদ্ধ” দেখানোর নামে বিভিন্ন রাসায়নিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে রিফাইন করা হয় তেল। এতে আসল সরিষার তেলের স্বাভাবিক গুণাগুণ অনেকটাই নষ্ট হয়ে যায়। যদিও বাজারের কিছু দামি ব্র্যান্ডে তুলনামূলকভাবে তেলের গুণমান কিছুটা বজায় থাকে বলে মত ক্রেতাদের একাংশের। চিকিৎসকদের একাংশের মতে, ভেজাল ভোজ্য তেল দীর্ঘদিন ব্যবহার করলে শরীরে নানা রোগ বাসা বাঁধতে পারে। এই পরিস্থিতিতে শুদ্ধ তেলের খোঁজে আমরা হাজির হয়েছিলাম আরামবাগের কালিপুর এলাকার একটি ঘানি কলে—যেখানে এখনও পুরনো পদ্ধতিতে সরিষা থেকে তেল উৎপাদন করা হয়।
কীভাবে তৈরি হয় কাঠের ঘানির তেল? ঘানি কলে প্রথমে সরিষা দানা সামান্য জল দিয়ে কাঠের ঘানিতে দেওয়া হয়। এরপর নির্দিষ্ট সময় ধরে ধীরে ধীরে ঘানি ঘুরতে থাকে এবং আস্তে আস্তে তেল বের হতে শুরু করে। প্রায় সমস্ত তেল বের হয়ে গেলে অবশিষ্ট খৈল আবার লোহার ঘানিতে দেওয়া হয়। লোহার ঘানিতে চাপ বেশি হওয়ায় খৈল থেকে অবশিষ্ট তেলও সহজে বের করে নেওয়া যায়।
ঘানি কলের এক কর্মকর্তা জানান, **কাঠের ঘানির তেল সাধারণত ১০ থেকে ১১ মাস পর্যন্ত ভালো থাকে**। অন্যদিকে **লোহার ঘানির তেল তুলনামূলকভাবে দ্রুত ব্যবহার করে ফেলা ভালো**, নাহলে নষ্ট হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। তাঁর দাবি, এখানে উৎপাদিত তেল সম্পূর্ণ বিশুদ্ধ।
সরিষা কম, ঘানি কলও কমছে- তবে শুদ্ধ তেলের এই ঐতিহ্য ধরে রাখা এখন বড় চ্যালেঞ্জ। ঘানি কল কর্তৃপক্ষের দাবি, আরামবাগ এলাকায় সরিষা চাষ ও ফলন কম হওয়ার কারণে বর্তমানে সরিষা দানার আমদানি আগের তুলনায় অনেকটাই কমে গেছে। ফলে বহু কাঠের ঘানি বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।কাঠের ঘানির রক্ষণাবেক্ষণ খরচও বেশি। তাই তেল উৎপাদনের খরচ তুলনামূলকভাবে বেড়ে যায়। তবে কর্তৃপক্ষের মতে, **সরিষা আমদানি বাড়লে উৎপাদন খরচ অনেকটাই কমানো সম্ভব**। বাজারের ভেজাল তেলের ভিড়ে যখন শুদ্ধতার প্রশ্ন উঠে আসছে, তখন আরামবাগের এই ঘানি কল যেন এখনও স্বাদ, গন্ধ আর ঐতিহ্যের এক জীবন্ত ঠিকানা। তবে সরিষার ঘাটতি ও বাড়তি খরচের চাপে আগামী দিনে এই ঘানি কলগুলির অস্তিত্ব টিকে থাকবে কি না, সেটাই এখন বড় প্রশ্ন। এবার আসুন জেনে নেই কোন কোন পদ্ধতিতে তেল তৈরি করা হয় এবং কোন পদ্ধতিতে তৈরি করা সরিষার তেল খাওয়া উচিত।
বর্তমান সময়ে ভোজ্যতেল আমাদের দৈনন্দিন খাদ্যাভ্যাসের একটি অপরিহার্য উপাদান। কিন্তু এই তেল কীভাবে উৎপাদিত হচ্ছে, তার পেছনের প্রযুক্তি ও প্রক্রিয়া সম্পর্কে সাধারণ মানুষের জানাশোনা খুবই সীমিত। বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহৃত ভোজ্যতেল উৎপাদনের বিভিন্ন পদ্ধতির মধ্যে সবচেয়ে বেশি প্রচলিত এবং লাভজনক পদ্ধতি হলো Solvent Extraction Method। তবে এই পদ্ধতির সঙ্গে জনস্বাস্থ্য, পুষ্টিগুণ এবং পরিবেশগত ঝুঁকির প্রশ্নও জড়িয়ে রয়েছে।
সলভেন্ট এক্সট্রাকশন পদ্ধতি —
এই পদ্ধতিতে প্রথমে সরিষা, সয়াবিন, সূর্যমুখী বা অন্য তৈলবীজ গুঁড়ো করা হয়। পরে সেই গুঁড়ো বাষ্পে সিদ্ধ করে বিভিন্ন পেট্রোলিয়াম-জাত দ্রাবকের সঙ্গে মেশানো হয়। সাধারণত Hexane ব্যবহৃত হয়, কারণ এটি তুলনামূলকভাবে সস্তা ও সহজলভ্য। এই দ্রাবকগুলো তৈলবীজের ভেতর থেকে প্রায় ৯৯ শতাংশ পর্যন্ত তেল নিষ্কাশন করতে সক্ষম।
এই উচ্চমাত্রার তেল আহরণ কর্পোরেট শিল্পের পক্ষে অত্যন্ত লাভজনক হলেও, প্রাথমিক অবস্থায় প্রাপ্ত তেল মানবভোগের উপযোগী থাকে না। ফলে পরবর্তী ধাপে এই তেলকে একাধিক রাসায়নিক ও তাপপ্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে পরিশোধন (Refining) করা হয়।
রিফাইনিং প্রক্রিয়া ও তার প্রভাব
রিফাইনিং মূলত তিনটি ধাপে সম্পন্ন হয়—নিউট্রালাইজেশন, ব্লিচিং ও ডিওডোরাইজেশন।
নিউট্রালাইজেশনে কস্টিক সোডার সাহায্যে ফ্রি ফ্যাটি অ্যাসিড ও অন্যান্য অম্লীয় উপাদান দূর করা হয়। ব্লিচিং ধাপে অ্যাক্টিভেটেড কার্বন বা ফুলার্স আর্থ ব্যবহার করে তেলের রং ও কিছু অবাঞ্ছিত উপাদান শোষণ করা হয়। ডিওডোরাইজেশন ধাপে ২০০ থেকে ২৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপে বাষ্প প্রয়োগ করে তেলের গন্ধ দূর করা হয়।
এই পুরো প্রক্রিয়ায় তেলের প্রাকৃতিক রং, ঘ্রাণের পাশাপাশি ভিটামিন A, E ও অন্যান্য অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পায়। উচ্চ তাপমাত্রার কারণে অল্প পরিমাণে ট্রান্স ফ্যাট সৃষ্টির আশঙ্কাও থাকে, যা দীর্ঘমেয়াদে হৃদরোগসহ বিভিন্ন অসংক্রামক রোগের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
পাতলা ও ঝকঝকে তেলের বাস্তবতা
বাজারে বহুল প্রচলিত নামী ব্র্যান্ডের ভোজ্যতেল সাধারণত খুব পাতলা, সমান ঘনত্বের ও চকচকে হয়। এই বৈশিষ্ট্যগুলি আসলে গভীর পরিশোধনের ফল। বিপরীতে, ঐতিহ্যবাহী পদ্ধতিতে উৎপাদিত তেল তুলনামূলকভাবে ঘন, স্বাভাবিক রঙিন এবং নিজস্ব ঘ্রাণযুক্ত হয়—যা তার প্রাকৃতিক গুণাগুণের পরিচায়ক।
বিকল্প পদ্ধতি: কোল্ড প্রেস ও হট প্রেস—
স্থানীয়ভাবে তৈলবীজ থেকে তেল উৎপাদনের দুটি প্রধান বিকল্প পদ্ধতি হলো কোল্ড প্রেস ও হট প্রেস।
কোল্ড প্রেস বা ঐতিহ্যবাহী ঘানি পদ্ধতিতে কোনো রাসায়নিক বা উচ্চ তাপমাত্রা ব্যবহার করা হয় না। শুধুমাত্র যান্ত্রিক চাপের মাধ্যমে তেল নিষ্কাশন করা হয়। এতে তেলবীজের প্রায় ৬০–৬৫ শতাংশ তেল পাওয়া যায়। অবশিষ্ট খৈল পশুখাদ্য ও জৈবসার হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
হট প্রেস বা এক্সপেলার পদ্ধতিতে বীজ হালকা গরম করে যান্ত্রিক চাপে তেল বের করা হয়। এতে তেলের পরিমাণ কিছুটা বেশি (৭৫–৮০ শতাংশ) পাওয়া গেলেও, তাপের কারণে কিছু পুষ্টিগুণ নষ্ট হতে পারে।
সলভেন্ট এক্সট্রাকশন ও গভীর রিফাইনিং পদ্ধতিতে উৎপাদিত তেল তুলনামূলকভাবে সস্তা হওয়ায় বাজার দখল করে রেখেছে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে এই প্রবণতা জনস্বাস্থ্য, স্থানীয় অর্থনীতি ও পরিবেশের জন্য চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।
অন্যদিকে, স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত কোল্ড প্রেস বা এক্সপেলার তেল ব্যবহার করলে একদিকে যেমন তেলের প্রাকৃতিক পুষ্টিগুণ বজায় থাকে, তেমনি গ্রামীণ জীবিকা, পশুপালন ও স্বনির্ভর অর্থনীতিও শক্তিশালী হয়।
ভোজ্যতেলের প্রশ্নটি কেবল স্বাদ বা দামের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি স্বাস্থ্য, কৃষি, পরিবেশ ও অর্থনীতির সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। তাই ভোক্তা হিসেবে সচেতন সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং নীতিনির্ধারকদের পক্ষ থেকে ঐতিহ্যবাহী ও তুলনামূলক নিরাপদ উৎপাদন পদ্ধতিকে উৎসাহ দেওয়া আজ সময়ের দাবি।

![]()

More Stories
আরামবাগ শহরজুড়ে বেহাল রাস্তা: গর্ত, পাথর উঠে বিপজ্জনক চলাচল—দুর্ঘটনার আশঙ্কা রামকৃষ্ণ সেতুর স্বাস্থ্য নিয়েও উদ্বেগ, মার্চের মধ্যে কাজ শেষের আশ্বাস পিডব্লিউডি-র
আরামবাগে টেরাকোটার প্রাচীন মন্দিরগুলি ধ্বংসের মুখে
খানাকুলের গর্ব প্রদীপ্ত বাগ: ডব্লিউবিসিএস উত্তীর্ণ হয়ে ডিএসপি পদে মনোনীত