February 4, 2026

আরামবাগ–খানাকুল রেলপথে রসুলপুর–জঙ্গলপাড়া হল্ট স্টেশন: আরামবাগের রেল যোগাযোগ ব্যবস্থায় নতুন দিশা, শিল্প-বিনিয়োগের সম্ভাবনা বাড়ছে

সোমালিয়া ওয়েব নিউজঃ আরামবাগ মহকুমার রেল যোগাযোগ ব্যবস্থায় আরও উন্নতির ইঙ্গিত মিলছে। সম্প্রতি রেল বোর্ডের অনুমোদনে আরামবাগ–খানাকুল এবং রসুলপুর–জঙ্গলপাড়া নতুন রেললাইনের Final Location Survey (FLS)-এর সিদ্ধান্তকে ঘিরে স্থানীয় স্তরে আশাবাদের পরিবেশ তৈরি হয়েছে। সাধারণ মানুষের যাতায়াত যেমন সহজ হবে, তেমনই শিল্প-বাণিজ্য ও কর্মসংস্থানের নতুন সম্ভাবনাও উন্মুক্ত হতে পারে বলে মত সংশ্লিষ্ট মহলের।

আরামবাগ–খানাকুল রেলপথে রসুলপুর–জঙ্গলপাড়া হল্ট স্টেশন সংক্রান্ত উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন পুরশুড়ার বিধায়ক বিমান ঘোষ। তিনি জানান, এই প্রকল্পের দাবিতে তিনি সম্প্রতি দিল্লিতে গিয়ে মাননীয় রেলমন্ত্রী অশ্বিনী বৈষ্ণবের কাছে আবেদন জানিয়েছিলেন। তারই ফলস্বরূপ পুরশুড়া সহ আরামবাগ মহকুমার মানুষের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশিত পরিষেবা বাস্তবায়নের পথে এগোল বলে তিনি মনে করছেন।

বিমান ঘোষ বলেন, “মাননীয় রেলমন্ত্রী অশ্বিনী বৈষ্ণব জীকে ধন্যবাদ। পুরশুড়ার মানুষকে শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন। রসুলপুর–জঙ্গলপাড়া হল্ট স্টেশন আরামবাগ মহকুমার সকল মানুষের জন্য রেলমন্ত্রীর উপহার।”

আরামবাগ মহকুমার রেল যোগাযোগ ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি। ভারত সরকারের রেল মন্ত্রক (রেল বোর্ড) পূর্ব রেলের অধীনে একাধিক নতুন রেল প্রকল্পের জন্য Final Location Survey (FLS) চালানোর অনুমোদন দিয়েছে। রেল বোর্ডের জারি করা অফিসিয়াল নথি অনুযায়ী, মোট ৫.৩৪ কোটি টাকা ব্যয়ে তিনটি রেল প্রকল্পের জন্য এই চূড়ান্ত সমীক্ষা হবে।

রেল বোর্ডের এই নির্দেশিকা New Delhi থেকে ২৭.০১.২০২৬ তারিখে জারি করা হয়েছে এবং তা পাঠানো হয়েছে Eastern Railway-এর জেনারেল ম্যানেজার, কলকাতা-র উদ্দেশ্যে।

কোন কোন প্রকল্পে FLS অনুমোদন

রেল বোর্ডের অনুমোদিত তালিকায় তিনটি প্রকল্পের নাম উল্লেখ রয়েছে—

  1. Siuri–Nala নতুন লাইন (via Rajnagar & Bakreshwar Dham)
  • আনুমানিক দৈর্ঘ্য: ৭৩ কিমি
  • FLS খরচ: ২১৯ লক্ষ টাকা
  1. Arambagh–Khanakul নতুন লাইন
  • আনুমানিক দৈর্ঘ্য: ২৭ কিমি
  • FLS খরচ: ৮১ লক্ষ টাকা
  1. Rasulpur–Jangalpara নতুন লাইন
  • আনুমানিক দৈর্ঘ্য: ৭৮ কিমি
  • FLS খরচ: ২৩৪ লক্ষ টাকা

সব মিলিয়ে মোট সমীক্ষা দৈর্ঘ্য ১৭৮ কিমি এবং মোট ব্যয় ৫৩৪ লক্ষ টাকা (অর্থাৎ ৫.৩৪ কোটি টাকা)

কী এই FLS এবং কেন গুরুত্বপূর্ণ

রেল প্রকল্পের ক্ষেত্রে Final Location Survey (FLS) অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। এই সমীক্ষার মাধ্যমে রেললাইন কোথা দিয়ে যাবে, স্টেশন/হল্টের সম্ভাব্য অবস্থান, জমি, সেতু-কালভার্ট, প্রযুক্তিগত সম্ভাব্যতা এবং আনুমানিক ব্যয় নির্ধারণ করে DPR (Detailed Project Report) তৈরির প্রস্তুতি নেওয়া হয়। অর্থাৎ, প্রকল্প বাস্তবায়নের পথে এটি একটি বড় অগ্রগতি।

এদিকে বোয়াইচণ্ডী – আরামবাগ এবং বোয়াইচণ্ডী – খানা নতুন রেললাইন প্রকল্পে নির্মাণকাজ শুরুর অনুমোদন হয়ে গেছে।

যোগাযোগ উন্নত হলে বদলাবে অর্থনীতির চাকা

আরামবাগ দীর্ঘদিন ধরেই কৃষিনির্ভর অর্থনীতির পাশাপাশি ক্ষুদ্র ব্যবসা, হস্তশিল্প ও স্থানীয় বাজারকেন্দ্রিক জীবনযাত্রার উপর দাঁড়িয়ে রয়েছে। কিন্তু উন্নত রেল সংযোগের অভাবে অনেক ক্ষেত্রেই পরিবহণ ব্যয় বেড়ে যায় এবং বাজার সম্প্রসারণে বাধা সৃষ্টি হয়। নতুন রেল প্রকল্পগুলি বাস্তবায়িত হলে আরামবাগ ও আশপাশের এলাকার মানুষের দ্রুত ও নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত হওয়ার পাশাপাশি পণ্য পরিবহণের সুযোগও বাড়বে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, রেল যোগাযোগ উন্নত হলে আরামবাগ মহকুমায় কয়েকটি ক্ষেত্রে শিল্পের সম্ভাবনা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারে—

  • কৃষিভিত্তিক প্রক্রিয়াকরণ শিল্প: ধান, আলু, সবজি, তেলবীজ ও অন্যান্য কৃষিপণ্যের প্রসেসিং ইউনিট গড়ে ওঠার সুযোগ
  • কোল্ড স্টোরেজ ও লজিস্টিক হাব: দ্রুত পরিবহণ ব্যবস্থায় কৃষিপণ্য সংরক্ষণ ও সরবরাহে সুবিধা
  • ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (MSME): স্থানীয় উদ্যোগে উৎপাদিত পণ্য কলকাতা ও অন্যান্য বাজারে সহজে পৌঁছনো
  • শিক্ষা ও স্বাস্থ্য পরিষেবার বিস্তার: রেল যোগাযোগ বাড়লে ছাত্রছাত্রী ও রোগীদের যাতায়াত সহজ হবে
  • পর্যটন ও সংস্কৃতিভিত্তিক অর্থনীতি: আরামবাগের আশপাশের ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক স্থানের সঙ্গে যোগাযোগ বৃদ্ধি

কর্মসংস্থানের সুযোগও বাড়বে

রেললাইন সম্প্রসারণ বা নতুন প্রকল্প বাস্তবায়নের ফলে শুধুমাত্র নির্মাণপর্বেই নয়, ভবিষ্যতে স্টেশন পরিচালনা, পরিষেবা, পরিবহণ, নিরাপত্তা, ব্যবসা এবং আনুষঙ্গিক কাজের ক্ষেত্রেও স্থানীয়ভাবে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হতে পারে বলে মনে করছেন অনেকে।

আরামবাগ মহকুমার বাসিন্দাদের একাংশের মতে, রেল যোগাযোগ উন্নত হলে কলকাতা-সহ বিভিন্ন শহরের সঙ্গে আরামবাগের দূরত্ব কার্যত কমে যাবে। ফলে শিক্ষার্থী, চাকরিজীবী ও ব্যবসায়ীদের জীবনযাত্রায় ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে। একইসঙ্গে শিল্প-বিনিয়োগের ক্ষেত্রে আরামবাগকে নতুনভাবে গুরুত্ব দেওয়া হতে পারে।

আরামবাগের রেল যোগাযোগ ব্যবস্থায় উন্নতির এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে তা শুধু যাতায়াতের সুবিধাই বাড়াবে না, বরং শিল্প-বাণিজ্য, কর্মসংস্থান ও সামগ্রিক উন্নয়নের ক্ষেত্রেও নতুন দিগন্ত খুলে দিতে পারে। এখন নজর থাকবে সমীক্ষা-পর্ব দ্রুত শেষ করে প্রকল্পগুলিকে বাস্তব রূপ দেওয়ার দিকে।

সব মিলিয়ে আরামবাগ খানাকুল স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, এই হল্ট স্টেশন চালু হলে যাতায়াত আরও সহজ হবে, শিক্ষার্থী, কর্মজীবী ও ব্যবসায়ীদের উপকার হবে এবং আরামবাগ–খানাকুল রেলপথের গুরুত্ব আরও বাড়বে।

Loading