সোমালিয়া ওয়েব নিউজঃ আজ ১০ই এপ্রিল। বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাসে এক অনন্য ব্যক্তিত্ব, প্রফুল্লচন্দ্র সেন–এর জন্মদিন। ‘আরামবাগের রূপকার’ এবং ‘আরামবাগের গান্ধী’ নামে পরিচিত এই স্বাধীনতা সংগ্রামী ও প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীকে ঘিরে আজও আবেগে ভাসে আরামবাগবাসী। কিন্তু প্রশ্ন একটাই—যাঁর হাত ধরে এই অঞ্চল উন্নতির আলো দেখেছিল, তাঁর নিজের বসতভিটাই আজ কেন ভেঙে পড়ার মুখে?
ভগ্নপ্রায় স্মৃতির ঠিকানা আরামবাগের মায়াপুরে সূত্রধর পাড়ায় মায়াপুর কল্যাণ কেন্দ্র। এটি প্রফুল্লচন্দ্র সেনের বসতভিটা যা আজ কার্যত ধ্বংসের পথে। বাড়ির চারদিকে ফাটল, ভেঙে পড়া দেওয়াল, ফুটো চাল—যেন ইতিহাস নিজেই ধীরে ধীরে মুছে যাচ্ছে। জানালাগুলো উইপোকার দখলে, দরজার কাঠ পচে ঘুন ধরে গেছে। ঘরের ভেতরে এখনও অক্ষত রয়েছে তাঁর ব্যবহার করা খাট, আলমারি, বই, সুটকেস, এমনকি বাথরুমের জিনিসপত্র ও তাঁর ব্যবহৃত দাঁতও। রয়েছে পুরনো চিঠিপত্র, দলিল, পত্রিকা—যেগুলি একসময় ইতিহাসের সাক্ষী ছিল। কিন্তু সঠিক সংরক্ষণের অভাবে এগুলিও দ্রুত নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।
ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামী থেকে মুখ্যমন্ত্রী-বাংলাদেশে জন্মগ্রহণ করা প্রফুল্লচন্দ্র সেন ছিলেন একনিষ্ঠ কংগ্রেস কর্মী। অসহযোগ আন্দোলনে অংশগ্রহণ করে তিনি স্বাধীনতা সংগ্রামে নিজেকে নিবেদন করেছিলেন। পরবর্তীকালে আরামবাগের এমএলএ থেকে উঠে এসে তিনি পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী হন। তাঁর সততা, সরলতা ও আদর্শবাদী জীবনযাপন তাঁকে গান্ধীবাদী নেতা আরামবাগের গান্ধী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছিল। তিনি আজীবন অবিবাহিত ছিলেন এবং মানুষের সেবাকেই জীবনের লক্ষ্য করেছিলেন।
স্মৃতি আগলে একা লড়াই বর্তমানে এই বসতভিটার দেখভালের দায়িত্বে রয়েছেন পূর্ণিমা মালিক। তাঁর বাবা মনসা মালিক ছিলেন প্রফুল্লচন্দ্র সেনের ঘনিষ্ঠ সহযোগী এবং সেই সূত্রেই এই দায়িত্ব এখন তাঁর কাঁধে।পূর্ণিমা দেবীর কথায়,”আমার নিজের কিছু নেই, বাবার আদর্শে এই বাড়িটা আগলে রেখেছি। কিন্তু আর পারছি না। ঘরের চাল ফুটো, বন্যায় জল ঢুকে যায়, থাকার মতো পরিবেশ নেই।”তিনি আরও জানান, যে সামান্য আর্থিক সাহায্য পাওয়া যায়, তা দিয়ে সংসার চালানোই কঠিন—বাড়ির সংস্কার তো দূরের কথা। অর্থের অভাব, উদ্যোগের সংকট এই বসতভিটা একটি ট্রাস্টি বোর্ডের অধীনে থাকলেও বাস্তবে তার রক্ষণাবেক্ষণে তেমন কোনো কার্যকর উদ্যোগ নেই। স্মৃতি রক্ষা কমিটির কোষাধ্যক্ষ বিশ্বনাথ বেরা জানান, স্থানীয়ভাবে অর্থ সংগ্রহ করে যতটা সম্ভব রক্ষণাবেক্ষণ করা হয়। কিন্তু তা অত্যন্ত অপ্রতুল। ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্যদের মধ্যে বর্তমানে জীবিত রয়েছেন বি কে রায়ের পুত্র, যিনি কেয়ারটেকারের জন্য মাসে ৫০০০ টাকা দেন। কিন্তু এই অর্থে একটি ঐতিহ্যবাহী বাড়ি সংরক্ষণ করা কার্যত অসম্ভব।
সবচেয়ে বড় অভিযোগ—রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব ও রাজনৈতিক উদাসীনতা।পূর্ণিমা মালিকের আক্ষেপ,”যাঁর জন্য অনেকের এত উন্নতি হলো, তাঁর বাড়ি নিয়ে কারোর কোনো মাথাব্যথা নেই। কংগ্রেস দলও এগিয়ে আসেনি। বর্তমান প্রার্থীরাও আসেননি একবারও। এমনকি সরকারি উদ্যোগেও এখনও পর্যন্ত কোনো বড়সড় সংস্কার বা সংরক্ষণ প্রকল্প নেওয়া হয়নি। পর্যাপ্ত ইলেক্ট্রিক আলোও নেই। শুধু তাই নয়, আরামবাগের পার্শ্ববর্তী খানাকুলের ডোঙ্গলে অবস্থিত ‘সাগর কুঠির’—যেখানে প্রফুল্ল চন্দ্র সেন বহু সময় অতিবাহিত করেছেন—সেই বাড়িটিও একইভাবে অবহেলিত ও জরাজীর্ণ অবস্থায় রয়েছে।
ঐতিহ্য হারানোর আশঙ্কায় প্রফুল্লচন্দ্র সেনের নামে আরামবাগ রেলস্টেশন, মেডিকেল কলেজসহ বহু প্রতিষ্ঠান থাকলেও তাঁর নিজের বসতভিটা আজ অবহেলিত। ইতিহাসবিদদের মতে, এই বাড়িটি শুধু একটি ব্যক্তির স্মৃতি নয়, এটি একটি যুগের সাক্ষ্য—স্বাধীনতা আন্দোলন, গ্রামীণ উন্নয়ন এবং রাজনৈতিক সততার প্রতীক। শেষ আবেদন পূর্ণিমা দেবীর কণ্ঠে শেষ অনুরোধ—”সরকার, প্রশাসন, রাজনৈতিক দল—সবাই যেন একবার এই জায়গাটার দিকে তাকায়। এটা শুধু একটা বাড়ি নয়, এটা ইতিহাস।”
প্রফুল্লচন্দ্র সেন শুধু একজন রাজনৈতিক নেতা নন, তিনি এক আদর্শের নাম। তাঁর জীবনের মূল্যবোধ, আত্মত্যাগ ও জনসেবার দৃষ্টান্ত আজও প্রাসঙ্গিক। কিন্তু তাঁর স্মৃতিচিহ্ন যদি এইভাবে হারিয়ে যায়, তবে তা শুধু আরামবাগ নয়, সমগ্র বাংলার জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি হবে। এখনই উদ্যোগ না নিলে—ভেঙে পড়বে শুধু একটি বাড়ি নয়, হারিয়ে যাবে এক ইতিহাস।






![]()

More Stories
আন্তর্জাতিক অঙ্কন প্রতিযোগিতায় গোল্ড অ্যাওয়ার্ড জিতল গোঘাটের রঘুবাটির খুদে শিল্পী অদিতি
ফুরফুরা পঞ্চায়েতে জট কাটল, ৫ বিজয়ীকে শংসাপত্র দেওয়ার নির্দেশ হাইকোর্টের
সহযোদ্ধার বিদায়, নিভে গেল এক নীরব শক্তির প্রদীপ—প্রয়াত গোঘাটের মনোরঞ্জন পালের স্ত্রী শোভা পাল