বিশ্বাস, শোক ও সংকল্পের দীর্ঘ যাত্রা: সোমনাথের পথে পায়ে হেঁটে বিশ্বজিৎ ঘোষ

সোমালিয়া ওয়েব নিউজ: বিশ্বাসের শক্তি কতটা গভীর হলে একজন মানুষ নিজের শরীরের কষ্ট, আরাম-আয়েশ ও নিরাপত্তাকে তুচ্ছ করে হাজার হাজার কিলোমিটার পথ পায়ে হেঁটে অতিক্রম করার সিদ্ধান্ত নিতে পারেন—তারই এক জীবন্ত উদাহরণ হয়ে উঠেছেন আরামবাগ পুরসভার ১৯ নম্বর ওয়ার্ডের বিজেপি কাউন্সিলর বিশ্বজিৎ ঘোষ। ২০২৫ সালের ২০ ডিসেম্বর আরামবাগ থেকে গুজরাটের ঐতিহাসিক সোমনাথ মন্দির দর্শনের উদ্দেশ্যে পায়ে হেঁটে রওনা দেন তিনি। প্রায় ২,২০০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই যাত্রাপথ সম্পূর্ণটাই হাঁটতে চেয়েছিলেন বিশ্বজিৎবাবু। কিন্তু ভাগ্য অন্য পরীক্ষা নিয়ে অপেক্ষা করছিল। যাত্রাপথে নারুলা এলাকায় পা পিছলে পড়ে গিয়ে গুরুতরভাবে আহত হন তিনি। ভেঙে যায় পা। শারীরিক যন্ত্রণায় থমকে গেলেও থামেনি তাঁর মানসিক শক্তি। শেষে গাড়িতে করে সোমনাথ দর্শন করেন। সেই কঠিন সময়ে তাঁর সহযাত্রী “ঘন্টা” নিরলসভাবে পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। হাসপাতালের দিনগুলোতে নিজের পরিবারের সদস্যের মতো সেবা-যত্ন করেছেন তিনি। পাশাপাশি প্রশাসনের দ্রুত আয়ুষ্মান কার্ড তৈরি করে দেওয়ায় সরকারি ব্যবস্থার মাধ্যমেই চিকিৎসার সুযোগ পান বিশ্বজিৎ ঘোষ। এই দীর্ঘ যাত্রা শুধু এক ধর্মীয় সফর ছিল না, ছিল এক গভীর আত্মনিবেদন। বাংলা থেকে ঝাড়খণ্ড, সেখান থেকে বিহার, উত্তরপ্রদেশ, মধ্যপ্রদেশ হয়ে গুজরাট—অসংখ্য পথ, অসংখ্য মানুষের মুখ আর অগণিত অভিজ্ঞতা নিয়ে এগিয়েছে তাঁর পদযাত্রা। পথে বিভিন্ন জায়গায় দলের নেতৃত্ব ও সংঘের কর্মকর্তারাও তাঁকে যথেষ্ট সাহায্য করেছেন। বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য, প্রতি ১০০ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করার পর ২০ মিটার করে দণ্ডী কেটেছেন তিনি। যা শুধুমাত্র শারীরিক কষ্ট নয়, ছিল এক গভীর সাধনা ও আত্মশুদ্ধির প্রতীক। তাঁর কথায়, এই যাত্রার উদ্দেশ্য কোনও ব্যক্তিগত চাওয়া-পাওয়া নয়। তিনি এই সাধনা উৎসর্গ করেছিলেন—পশ্চিমবঙ্গের খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষের জন্য, নিজের দলের নেতৃত্ব ও কর্মীদের জন্য, তাঁর ১৯ নম্বর ওয়ার্ডের মানুষের জন্য, সনাতনী হিন্দু সমাজের জন্য, দেশের সীমান্তে জল, স্থল ও আকাশপথে কর্মরত ভারতীয় সেনাদের জন্য, গণতন্ত্রের চতুর্থ স্তম্ভ সংবাদমাধ্যমের জন্য এবং সর্বোপরি সমগ্র দেশবাসীর মঙ্গল কামনায়। এই যাত্রার পেছনে রয়েছে এক গভীর ব্যক্তিগত বেদনাও। প্রায় এক বছর আগে মায়ের মৃত্যু হয় বিশ্বজিৎ ঘোষের। সেই শোক তাঁকে ভিতর থেকে ভেঙে দিয়েছিল। মায়ের স্মৃতি, তাঁর আশীর্বাদ এবং আত্মার শান্তির উদ্দেশ্যেই এক বছর পরে এই কঠিন সংকল্প গ্রহণ করেন তিনি। নিজের মনের শক্তি, অদম্য ইচ্ছাশক্তি এবং কয়েকজন আত্মীয়-বন্ধুর সহযোগিতায় শুরু করেছিলেন এই যাত্রা। দীর্ঘ পথ চলার সময় সাধারণ মানুষই হয়ে উঠেছিলেন তাঁর সবচেয়ে বড় শক্তি। কোথাও ধর্মশালা, কোথাও ছোট হোটেল, কখনও রাস্তার ধাবায় রাত কেটেছে তাঁর। বহু অচেনা মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে তাঁকে খাবার দিয়েছেন, জল দিয়েছেন, আশ্রয় দিয়েছেন। এই মানবিকতার স্পর্শ তাঁকে আরও দৃঢ় করেছে। বিশ্বজিৎ ঘোষের এই ব্যতিক্রমী ও কষ্টসাধ্য যাত্রার কথা ইতিমধ্যেই বহু মানুষের হৃদয় স্পর্শ করেছে। ধর্মের প্রতি কতটা আস্থা, শ্রদ্ধা ও আত্মনিবেদন থাকলে একজন মানুষ এমন দুঃসাহসিক পদযাত্রায় নামতে পারেন—তা নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে তাঁর এই সাধনা। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয়, আহত অবস্থায় ফিরে এসেও থেমে থাকেননি তিনি। হাতে ক্রাচ নিয়েই নির্বাচনী প্রচারে অংশ নিয়েছেন। হেমন্ত বাঘের সমর্থনে ভোট প্রচারে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছেন তিনি। যাত্রাপথের প্রতিটি মুহূর্তে ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করেছেন পশ্চিমবঙ্গের সরকার পরিবর্তনের জন্য। পরবর্তীতে আবেগঘন কণ্ঠে, চোখে জল নিয়ে বিশ্বজিৎ ঘোষ বলেন, “আমার মনের ইচ্ছা, আশা—সব পূরণ হয়ে গেছে। ভগবানের কাছে যা চেয়েছিলাম, তিনি তা দিয়েছেন।” বিশ্বাস, শোক, আত্মত্যাগ ও সংকল্পের এই পথচলা আজ শুধুমাত্র একজন মানুষের ব্যক্তিগত সাধনা নয়—তা হয়ে উঠেছে সমাজের কাছে এক অনন্য অনুপ্রেরণা।

Loading