মাটির মানুষের গান, জীবনসংগ্রামের নাম তারক রায়

সোমালিয়া ওয়েব নিউজ: অতি সাধারণ মনের মানুষ তিনি। নিজের খেয়াল, নিজের কাজ আর সংসার নিয়েই দিন কেটে যায় গোঘাটের মাধবপুর গ্রামের তারক রায়ের। নেই বড় কোনও চাহিদা, নেই বিলাসিতার স্বপ্ন। তবুও ছোট্ট সংসারটাকে ভালোবাসা, পরিশ্রম আর মনের আনন্দ দিয়ে আগলে রেখেছেন তিনি ও তার স্ত্রী বুল্টি।দীর্ঘ ১৫ বছরের দাম্পত্য জীবন। এক ছেলে ও এক মেয়েকে নিয়ে তাদের ছোট্ট পরিবার। চাষযোগ্য মাত্র দুই বিঘা জমি। বাড়িতে রয়েছে পাঁচটি গরু, কয়েকটি ছাগল ও ৬১টি হাঁস। এই সামান্য সম্বল নিয়েই কোনওরকমে চলে যায় সংসার। অভাব রয়েছে, কিন্তু সেই অভাবকে কখনও দুঃখে পরিণত হতে দেননি তারক। অর্থের প্রাচুর্য না থাকলেও তাদের জীবনে রয়েছে সুখ, শান্তি আর একে অপরের প্রতি গভীর ভালোবাসা। গ্রামের মাটির মানুষ তারক রায় ও তার স্ত্রী দুজনেই গান ভালোবাসেন। কাজের ফাঁকে, জীবনের ক্লান্তির মাঝেও গানই যেন তাদের মনের আশ্রয়। মাঠে কাজ করতে করতেই কখনও সুর ভেসে আসে, কখনও আবার সমাজের নানা ঘটনা তারকের মনে তৈরি করে নতুন নতুন কথামালা। সেই অনুভূতিই ধীরে ধীরে রূপ নেয় গানে। তারক পড়াশোনা করেছিলেন নবম শ্রেণি পর্যন্ত। পড়াশোনায় তিনি যথেষ্ট ভালো ছিলেন। কিন্তু সংসারের অভাব-অনটন তার শিক্ষার পথ থামিয়ে দেয়। টাকার অভাবে আর পড়াশোনা এগিয়ে নিয়ে যেতে পারেননি। তবে শিক্ষার প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা আজও অটুট রয়েছে তার মধ্যে। আরামবাগের বিশিষ্ট চিকিৎসক ডাঃ সাবর্ণী মণ্ডলের সঙ্গে একসময় একসাথেই পড়াশোনা করেছেন তারক। আজও সেই সম্পর্ক একইরকম মধুর। ক্লাসমেট হিসেবে ডাঃ মণ্ডল বিভিন্ন সময় তারককে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন। সেই সহমর্মিতার কথা কৃতজ্ঞতার সঙ্গেই স্বীকার করেছেন তারক রায়। জীবনের নানা ঘাত-প্রতিঘাত খুব কাছ থেকে দেখেছেন তিনি। সমাজের পরিবর্তন, কৃষকের কষ্ট, অভাবের যন্ত্রণা, বর্তমান সময়ের অস্থিরতা—সবকিছুই গভীরভাবে ভাবায় তাকে। সমাজের বাস্তবচিত্র তার মনকে বারবার নাড়া দেয়। আর সেই ভাবনা থেকেই জন্ম নেয় তার গান। তারকের লেখা গান কেবল বিনোদন নয়, সেখানে উঠে আসে গ্রামের মানুষের না বলা কথা। কৃষকের চোখের জল, দিনমজুরের লড়াই, সমাজের বৈষম্য, মানুষের ভাঙা স্বপ্ন—সবকিছুই তার গানের কথায় ধরা পড়ে। কোনও বড় মঞ্চ নয়, কোনও আধুনিক স্টুডিও নয়, জীবনের অভিজ্ঞতাই তার সৃষ্টির সবচেয়ে বড় শক্তি। তার স্ত্রী বুল্টিও স্বামীর সম্পর্কে বলতে গিয়ে আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন। বুল্টির কথায়, “তারক অত্যন্ত সাধারণ মনের মানুষ এবং খুবই ভালো। আজকের দিনে এরকম মানুষ সত্যিই খুব কম দেখা যায়। সংসারের সব দায়িত্ব নিজের কাঁধে নিয়ে হাসিমুখে চলতে জানে ও। মানুষের কষ্ট বুঝতে পারে বলেই ওর গানের মধ্যেও মানুষের জীবনের কথা উঠে আসে।” আজকের সমাজে যখন অর্থ ও প্রতিযোগিতার দৌড়ে মানুষ ক্রমশ যান্ত্রিক হয়ে উঠছে, তখন তারক রায়ের মতো মানুষরা মনে করিয়ে দেন—সুখ মানে শুধু অর্থ নয়। ভালোবাসা, পরিশ্রম, মানবিকতা আর মাটির গন্ধমাখা জীবনও মানুষকে সত্যিকারের আনন্দ দিতে পারে। গ্রামের সাধারণ এক কৃষক হয়তো তিনি, কিন্তু তার ভাবনা, তার অনুভূতি আর তার গানের মধ্যে লুকিয়ে রয়েছে সমাজের এক নির্মম অথচ বাস্তব প্রতিচ্ছবি। তাই তারক রায় শুধুই একজন মানুষ নন, তিনি গ্রামবাংলার সংগ্রামী জীবনের এক জীবন্ত প্রতীক।

Loading