Oplus_16908288

আনুড় গ্রামের শ্রীশ্রী বিশালাক্ষী মায়ের আবির্ভাব ও মাহাত্ম্য: ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণদেবকে ঘিরে এক পবিত্র ইতিহাস

সোমালিয়া ওয়েব নিউজ: হুগলি জেলার আনুড় গ্রামের বুকে আজও জাগ্রত হয়ে রয়েছেন শ্রীশ্রী বিশালাক্ষী মা। শতাব্দীপ্রাচীন এই তীর্থস্থান শুধুমাত্র একটি মন্দির নয়, এটি গ্রামবাংলার আধ্যাত্মিক ঐতিহ্য, লোকবিশ্বাস এবং শ্রীরামকৃষ্ণদেবের স্মৃতিবিজড়িত এক পবিত্র সাধনভূমি। যুগের পর যুগ ধরে ভক্তদের কাছে এই মন্দির পরম ভক্তি, বিশ্বাস ও অলৌকিকতার কেন্দ্রস্থল হয়ে রয়েছে। বর্তমান মন্দিরের পুরোহিত হারাধন মল্লিক জানিয়েছেন, মাত্র ১১ বছর বয়স থেকেই তিনি এই মন্দিরে পূজার দায়িত্ব পালন করছেন। তাঁর পরিবার বহু প্রজন্ম ধরে এই মন্দিরের সেবার সঙ্গে যুক্ত। তিনি জানান, তাঁদের পূর্বপুরুষদের পদবি ছিল গঙ্গোপাধ্যায়। বর্ধমান মহারাজার কাছ থেকে তাঁদের পরিবার “মৌলিক” উপাধি লাভ করে, যা সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হয়ে বর্তমানে “মল্লিক” পদবিতে রূপান্তরিত হয়েছে। স্থানীয় জনশ্রুতি অনুযায়ী, যখন পরমহংসদেব ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ ছোটবেলায় “গদাই” নামে পরিচিত ছিলেন, তখন তিনি গ্রামের মা-কাকিমাদের সঙ্গে নিয়মিত এই বিশালাক্ষী মন্দিরে পূজা দিতে আসতেন। একদিন মায়ের দর্শন করতে এসে তিনি দেবীর অলৌকিক রূপ প্রত্যক্ষ করেন। সেই দর্শনের পর তিনি ভাবাবিষ্ট হয়ে জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। সঙ্গে থাকা মহিলারা তাঁর চোখে-মুখে জল ছিটিয়ে এবং মা বিশালাক্ষীর নাম স্মরণ করিয়ে দিলে তাঁর জ্ঞান ফিরে আসে। এই ঘটনাকে আজও ভক্তরা দেবীর অলৌকিক কৃপা হিসেবে মনে করেন। মন্দিরের সঠিক প্রতিষ্ঠাকাল জানা না গেলেও স্থানীয়দের মতে এর বয়স আনুমানিক ৪০০ থেকে ৫০০ বছরের মধ্যে। একসময় এটি ছিল কাপালিক সাধকদের সাধনাস্থল। তখন মন্দির ছিল খড়ের ছাউনি ও মাটির দেওয়াল দিয়ে নির্মিত একটি সাধারণ উপাসনাস্থল। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ভক্তদের উদ্যোগে বর্তমান রূপ লাভ করেছে। হারাধন মল্লিক আরও জানান, শ্রীরামকৃষ্ণদেবের দিদি কাত্যায়নী দেবীর বাড়িও এই এলাকায় ছিল, যদিও বর্তমানে সেই বাড়ির কোনও অস্তিত্ব নেই। এমনকি শ্রীশ্রী সারদা মাও এই মন্দিরে পূজা দিতে এসেছিলেন বলে স্থানীয়দের মধ্যে প্রচলিত বিশ্বাস রয়েছে। মন্দির প্রাঙ্গণে সংরক্ষিত ইতিহাস অনুযায়ী, সুদূর অতীতে কামাখ্যা মায়ের সিদ্ধসাধক পুরোহিত ভোলাচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় একসময় শ্রীশ্রী বিশালাক্ষী মূর্তির অংশবিশেষ সঙ্গে নিয়ে সাধনপীঠ প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে যাত্রা করেছিলেন। গভীর রাতে তিনি বর্তমান আনুড় গ্রামের এক নির্জন শ্মশানসদৃশ স্থানে বিশ্রাম নেন। পরে নানা অলৌকিক ঘটনা ও দেবী-ইঙ্গিতের মাধ্যমে সেই স্থানেই প্রতিষ্ঠিত হয় বর্তমান বিশালাক্ষী মায়ের ঘটী-মূর্তি। অনেকের মতে, এই মূর্তি আসলে মা কামাখ্যার যোনিরূপ শক্তিপীঠের প্রতীক। তাই শক্তিসাধকদের কাছেও এই মন্দিরের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। মন্দিরে মানত করার একটি বিশেষ প্রথা আজও প্রচলিত। ভক্তরা মাটির ঘোড়া নিবেদন করে মায়ের কাছে মানত করেন। মনোবাসনা পূর্ণ হলে আবার মায়ের চরণে এসে কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করেন। স্থানীয়দের বিশ্বাস, মা বিশালাক্ষী অত্যন্ত জাগ্রত দেবী এবং আন্তরিক ভক্তির সঙ্গে প্রার্থনা করলে তিনি ভক্তদের মনোবাসনা পূর্ণ করেন। প্রতি বছর অক্ষয় তৃতীয়ার দিনে এখানে অনুষ্ঠিত হয় বিশাল বার্ষিক পূজা ও উৎসব। দূরদূরান্ত থেকে হাজার হাজার ভক্ত সমবেত হন এই পূজায়। এছাড়াও পৌষ সংক্রান্তির দিনে পুরোহিত পরিবারের বাড়িতে অনুষ্ঠিত হয় মা বিশালাক্ষীর বিশেষ অন্নভোগ, যা বহু ভক্তের কাছে এক পবিত্র আচার হিসেবে বিবেচিত। এই মন্দিরকে ঘিরে শুধুমাত্র ধর্মীয় বিশ্বাস নয়, রয়েছে গ্রামবাংলার লোকসংস্কৃতি ও ঐতিহ্যেরও এক অনন্য মেলবন্ধন। আজও বহু মানুষ এখানে এসে মানত করেন, পূজা দেন এবং মায়ের আশীর্বাদ লাভের জন্য প্রার্থনা করেন। বর্তমানে স্থানীয় মানুষ ও ভক্তদের সহযোগিতায় মন্দিরের উন্নয়নের কাজ চলছে। মন্দির চত্বরের সৌন্দর্যায়ন, ভক্তদের জন্য পরিকাঠামো উন্নয়ন এবং ধর্মীয় কর্মকাণ্ডকে আরও সুসংগঠিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ধর্ম, ইতিহাস, লোকবিশ্বাস এবং শ্রীরামকৃষ্ণদেবের স্মৃতিকে একসূত্রে বেঁধে রাখা আনুড় গ্রামের শ্রীশ্রী বিশালাক্ষী মন্দির আজও বাংলার আধ্যাত্মিক মানচিত্রে এক গুরুত্বপূর্ণ স্থান অধিকার করে রয়েছে। ভক্তদের কাছে এটি শুধু একটি মন্দির নয়, বরং বিশ্বাস, ভক্তি ও চিরন্তন শক্তির এক জীবন্ত প্রতীক।

Oplus_16908288

Loading