November 3, 2026

“ক্ষমতার শীর্ষে থেকেও নিঃস্ব বিদায়—ভুলে যাওয়া এক সততার প্রতীক”

চার জোড়া ধুতি, এক আলমারি বই—এই ছিল এক প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীর শেষ সম্বল!

সোমালিয়া ওয়েব নিউজ: ক্ষমতার শিখরে থেকেও যাঁর জীবনে ছিল না প্রাসাদ, ছিল না বিলাসিতা—ছিল শুধু আদর্শ, সততা আর মানুষের জন্য নিঃস্বার্থ ভালোবাসা। আজ যখন রাজনীতি মানেই বিতর্ক, সম্পত্তি আর প্রভাবের সমার্থক হয়ে উঠেছে, তখন ইতিহাসের পাতায় এক উজ্জ্বল ব্যতিক্রম হয়ে জ্বলজ্বল করেন প্রফুল্লচন্দ্র সেন।

১৯৯০ সালে, নিঃশব্দে পৃথিবী ছেড়ে চলে যান পশ্চিমবঙ্গের তৃতীয় মুখ্যমন্ত্রী। মৃত্যুর সময় তাঁর সম্পত্তি বলতে ছিল মাত্র চার জোড়া ধুতি-পাঞ্জাবি এবং এক আলমারি ভর্তি বই। শেষ জীবন কেটেছে এক কামরার ছোট্ট ফ্ল্যাটে, চিকিৎসার খরচ জোগাতেও হিমশিম খেতে হয়েছে তাঁকে। এ যেন এক নির্মম প্রশ্ন ছুঁড়ে দেয়—এই কি সেই মানুষ, যিনি একসময় গোটা রাজ্যের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন?

সাদা খদ্দরের পোশাক, মিতভাষী স্বভাব, আর একেবারে অনাড়ম্বর জীবনযাপন—এই ছিল তাঁর পরিচয়। প্রশাসনে ছিলেন কঠোর, কিন্তু ন্যায়নিষ্ঠ। অনেকেই বলতেন, “প্রফুল্লবাবু নিয়ম মানেন, আর নিয়ম মানাতেও জানেন।” অথচ সেই মানুষটিকেই রাজনৈতিক স্বার্থে কুৎসার শিকার হতে হয়েছিল—রটানো হয়েছিল, তিনি নাকি কলকাতার বিখ্যাত স্টিফেন হাউস কিনে নিয়েছেন!

১৯৬২ সালে বিধানচন্দ্র রায়-এর মৃত্যুর পর মুখ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেন প্রফুল্লচন্দ্র সেন। সেই সময় বাংলা জুড়ে ভয়াবহ খাদ্য সংকট। মজুতদারদের কালোবাজারির বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নিতে তিনি চালু করেন রেশন ব্যবস্থা ও লেভি সিস্টেম। সাধারণ মানুষকে বাঁচাতে তিনি সাহসী সিদ্ধান্ত নেন, কিন্তু সেই সিদ্ধান্তই তাঁকে জনরোষের মুখে ঠেলে দেয়।

খাদ্য সংকটের সময় মানুষের কাছে তাঁর আবেদন ছিল—ভাতের বদলে রুটি, শাকসবজি, কাঁচকলা খেয়ে জীবনধারণ করুন। বিধানসভায় তাঁর সেই বক্তব্য—“ভাতের সঙ্গে কাঁচকলা, পটল, কুমড়ো সিদ্ধ খেয়ে পেট ভরান”—তখন হাস্যরস, বিদ্রূপ আর রাজনৈতিক আক্রমণের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে। আর সেখান থেকেই জন্ম নেয় এক তির্যক উপাধি—“কাঁচকলা সেন”।

কিন্তু এই নামের আড়ালে চাপা পড়ে যায় তাঁর সংগ্রামী জীবন। ১৮৯৭ সালের ১০ এপ্রিল, খুলনার সেনহাটি গ্রামে জন্ম। পরে পড়াশোনা স্কটিশ চার্চ কলেজ-এ। উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশ যাওয়ার প্রস্তুতি চলছিল, কিন্তু মহাত্মা গান্ধী-র আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে তিনি ঝাঁপিয়ে পড়েন স্বাধীনতা আন্দোলনে।

আরামবাগ-কেই বেছে নেন কর্মভূমি হিসেবে। ম্যালেরিয়ায় জর্জরিত সেই অঞ্চলে থেকেও মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন নিরলসভাবে। সত্যাগ্রহ, স্বদেশি, লবণ আইন অমান্য আন্দোলন থেকে শুরু করে ‘ভারত ছাড়ো’ আন্দোলন—প্রতিটি সংগ্রামে তাঁর সক্রিয় অংশগ্রহণ তাঁকে মানুষের কাছে করে তোলে “আরামবাগের গান্ধী”।

১৯৬৭ সালের নির্বাচনে পরাজয় আসে। দীর্ঘ কংগ্রেস শাসনের অবসান ঘটে। বলা হয়, সেদিন নাকি কলকাতার বাজারে কাঁচকলার দামও বেড়ে গিয়েছিল—সময়ের নির্মম পরিহাস! এরপর রাজনীতি থেকে সরে গিয়ে বই আর লেখালেখির মধ্যেই নিজেকে ডুবিয়ে রাখেন এই অকৃতদার মানুষটি।

আজ, যখন চারদিকে সম্পদের ঝলকানি, তখন প্রশ্ন জাগে—এইরকম সততা কি শুধুই ইতিহাসের পাতায় বন্দি হয়ে থাকবে?
প্রফুল্লচন্দ্র সেন শুধু একজন রাজনীতিবিদ নন, তিনি এক আদর্শ—যেখানে ক্ষমতা নয়, মানুষের সেবা ছিল জীবনের একমাত্র লক্ষ্য।

সময়ের স্রোতে আমরা তাঁকে ভুলে গেছি, কিন্তু তাঁর জীবন যেন আজও নিঃশব্দে আমাদের বিবেককে প্রশ্ন করে—
“রাজনীতি কি শুধুই ক্ষমতার জন্য, নাকি মানুষের জন্য?”

Loading