হিসেবের খাতায় জীবন নয়—রাস্তার ধারে টিকে থাকা এক পরিবারের নীরব লড়াই, প্রশ্নের মুখে মানবিকতা

 সোমালিয়া ওয়েব নিউজ: নিত্যদিন আমরা লাভ-লোকসানের হিসেব কষে চলি—কত খরচ হলো, কত রইল, কোথায় বাঁচানো গেল—সব কিছুই যেন খাতার পাতায় বন্দি। সংসারের খরচ থেকে শুরু করে জীবনের ছোট বড় প্রাপ্তি, অনেকেই তা ডায়রিতে লিখে রাখেন যত্ন করে। কিন্তু সত্যিই কি জীবনকে এভাবে মাপা যায়? মনে পড়ে যায় শ্যামল মিত্রের সেই বিখ্যাত গান—“জীবন খাতার প্রতি পাতায় যতই লেখ হিসাব নিকাশ, কিছুই রবে না…”। আজকের এই আধুনিক, প্রযুক্তিনির্ভর সমাজে আমরা প্রতিনিয়ত ছুটছি—নতুন বছরের নতুন চাওয়া, নতুন স্বপ্ন, আর কৃত্রিম চাহিদার অন্তহীন প্রতিযোগিতায় নিজেদের ঠেলে দিচ্ছি আরও গভীরে। সেই দৌড়ে কোথাও যেন হারিয়ে যাচ্ছে মানবিকতা, হারিয়ে যাচ্ছে থেমে ভাবার ক্ষমতা।

কিন্তু এই ব্যস্ততার মাঝেই যদি একটু থামা যায়, যদি চোখ মেলে দেখা যায় চারপাশ—তাহলেই বোঝা যাবে বাস্তবের অন্য এক চিত্র। গোঘাটের ভাদুড় অঞ্চলের বেলী গ্রামে প্রধান রাজ্য সড়কের ধারে বসবাস করে এক পরিবার, যাদের জীবনের গল্প যেন আমাদের সমস্ত হিসেব-নিকেশকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়। আদিবাসী পরিবারের কর্তা  বীরেন সরেন জানান, তাঁর বাড়ি ছিল বাঁকুড়া জেলার খাতড়াতে। প্রায় ৩০ বছর আগে খাদ্যের অভাবে সব ছেড়ে চলে আসতে বাধ্য হন এখানে। তারপর থেকে রাস্তার ধারের এই সামান্য জায়গাটাই তাঁদের ঠিকানা, তাঁদের আশ্রয়।

দিন-রাত গাড়ির শব্দ, ধুলো, ঝড়-বৃষ্টি—সবকিছুর মাঝেই কেটে যাচ্ছে তাঁদের জীবন। পাশেই রাস্তার নয়ন জলি, বর্ষাকালে সেই জল দুয়ারে উঠে আসে।৩০ বছর ধরে এই পরিবেশে অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছেন তাঁরা, এতটাই যে এখন আর দ্রুতগতির যানবাহনকেও ভয় পান না। কিন্তু সেই অভ্যস্ততার আড়ালে লুকিয়ে আছে এক চরম অনিশ্চয়তা—যেকোনো মুহূর্তে ঘটে যেতে পারে বড়সড় দুর্ঘটনা। আরও কঠিন বাস্তব হল, এই পরিবারে রয়েছে ছোট  বাচ্চাও, যাদের বড় করে তোলা হচ্ছে এই ব্যস্ত রাস্তার ধারে, যেখানে নিরাপত্তা বলতে কিছুই নেই।

সরকারি বিভিন্ন প্রকল্পের আওতায় কিছু সামান্য সুবিধা পেলেও, যেমন লক্ষ্মীর ভাণ্ডার, কিন্তু এখনও পর্যন্ত এই পরিবারটি পায়নি একটি স্থায়ী বাড়ি, পায়নি কোনো পাট্টা জমি। তিন দশক কেটে গেলেও তাদের জীবনে তেমন কোনো পরিবর্তন আসেনি। উন্নয়নের আলো যেন আজও পৌঁছয়নি এই রাস্তার ধারে বসবাসকারী মানুষগুলোর কাছে।

এই চিত্র শুধু একটি পরিবারের নয়, এরকম বহু পরিবার রয়েছে যারা আজও রাজ্য সড়কের ধারে বিপদের মুখে বসবাস করছে। যানবাহনের সংখ্যা যেভাবে বাড়ছে, তাতে করে ঝুঁকিও বেড়ে চলেছে প্রতিদিন। প্রশ্ন উঠছে—আমরা যারা নিজেদের নিয়ে ব্যস্ত, আমরা কি কখনও ভেবে দেখেছি এই মানুষগুলোর কথা? প্রশাসনের কি কোনো দায় নেই?

হয়তো আমাদের জীবন তুলনামূলকভাবে অনেক স্বচ্ছল, অনেক নিরাপদ। কিন্তু সেই উপলব্ধিটা আসে তখনই, যখন আমরা নিজেদের চেয়ে কম সুবিধাপ্রাপ্ত মানুষের দিকে তাকাই। আর যদি আমরা সবসময় নিজেদের থেকে বেশি ধনী বা সফল মানুষের সঙ্গে তুলনা করি, তাহলে এই দৌড় কখনোই শেষ হবে না—শুধু বাড়বে অস্থিরতা।

এই পরিবারের জীবন আমাদের শেখায়, সুখের সংজ্ঞা শুধু অর্থ বা আরামে নয়, বরং নিরাপত্তা আর মৌলিক অধিকারেও লুকিয়ে থাকে। তাই প্রশ্ন রয়ে যায়—এই মানুষগুলোর জন্য কি সত্যিই আমাদের, সমাজের এবং প্রশাসনের কিছুই করার নেই? নাকি আমরা এখনও সেই উত্তর খুঁজে পেতে প্রস্তুত নই?

Loading