শ্রীরামকৃষ্ণের দৃষ্টিতে শ্রীমা সারদা দেবী: শ্রদ্ধা, সম্ভ্রম ও নির্মল ভালোবাসার আদর্শ

সোমালিয়া ওয়েব নিউজঃ শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেব ও শ্রীশ্রী সারদা দেবীর সম্পর্ক ছিল আধ্যাত্মিকতা, পারস্পরিক শ্রদ্ধা এবং নির্মল ভালোবাসার এক অনন্য উদাহরণ। তাঁদের দাম্পত্যে অধিকার বা অহংকারের স্থান ছিল না; ছিল শুধুই সম্মান, সৌজন্য এবং পরস্পরের প্রতি গভীর শ্রদ্ধাবোধ।

শ্রীমা সারদা দেবী নিজেই বলেছেন, “তিনি কখনও আমাকে ‘তুই’ পর্যন্ত বলেননি।” একদিন দক্ষিণেশ্বরে শ্রীমা যখন শ্রীরামকৃষ্ণের জন্য খাবার নিয়ে গিয়েছিলেন, তখন তিনি ভেবেছিলেন ভ্রাতুষ্পুত্রী লক্ষ্মী খাবার রেখে যাচ্ছে। তাই বলেছিলেন, “দরজাটা ভেজিয়ে দিয়ে যাস।” কিন্তু শ্রীমার কণ্ঠস্বর শুনেই তিনি বিস্মিত হয়ে ক্ষমা চেয়ে বলেন, “আহা, তুমি! আমি ভেবেছিলাম লক্ষ্মী। কিছু মনে কোরো না।”

শুধু তাই নয়, এই সামান্য সম্বোধনের জন্যও শ্রীরামকৃষ্ণ এতটাই অনুতপ্ত হয়েছিলেন যে পরদিন নিজে নহবতে গিয়ে বলেছিলেন, “দেখ গো, সারারাত আমার ঘুম হয়নি, ভেবে ভেবে—কেন এমন রূঢ় বাক্য বলে ফেললাম।”

সেই সময় বাংলার সমাজে স্ত্রীকে ‘তুই’ বলে সম্বোধন করা খুবই স্বাভাবিক ছিল। কিন্তু শ্রীরামকৃষ্ণ তাঁর আচরণের মাধ্যমে দেখিয়েছিলেন, প্রকৃত ভালোবাসার ভিত্তি হলো সম্মান। শ্রীমাও স্মরণ করেছেন, “তিনি আমার সঙ্গে কি ব্যবহারই করতেন! একদিনও মনে ব্যথা পাবার মতো কিছু বলেননি। কখনও ফুলটি দিয়েও ঘা দেননি।”

শ্রীরামকৃষ্ণ শ্রীমাকে কেবল সহধর্মিণী হিসেবে নয়, জগজ্জননী রূপে দেখতেন। তাই শ্রীমা তাঁর পায়ে হাত বুলিয়ে দিলে তিনিও তাঁকে নমস্কার করতেন। আবার শ্রীমা যখন তাঁর জন্য আহার নিয়ে আসতেন, তখন তিনি “মা ব্রহ্মময়ী, মা ব্রহ্মময়ী” বলে শ্রদ্ধাভরে উঠে দাঁড়াতেন।

এই ঘটনাগুলি আমাদের শেখায় যে প্রকৃত সম্পর্কের ভিত্তি কখনও কর্তৃত্ব নয়, বরং শ্রদ্ধা, সৌজন্য, সহমর্মিতা এবং আন্তরিক ভালোবাসা। শ্রীরামকৃষ্ণ ও শ্রীমা সারদা দেবীর জীবন আজও মানবসমাজের কাছে পারস্পরিক সম্মান ও আদর্শ দাম্পত্যের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।

তথ্যসূত্র: শতরূপে সারদা — স্বামী লোকেশ্বরানন্দ।

Loading