প্রতারণার ফাঁদে রাশিয়ার সেনাবাহিনীতে ভারতীয়রা: ১৩৯ জন দেশে ফিরলেও এখনো আটকে প্রায় ২৪, সতর্ক করলেন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল

সোমালিয়া ওয়েব নিউজ: বিদেশে উচ্চ বেতনের চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে প্রতারণার মাধ্যমে বহু ভারতীয় নাগরিককে রাশিয়ায় নিয়ে গিয়ে সেনাবাহিনীতে যুক্ত করার ঘটনা আন্তর্জাতিক মহলে উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে এই ঘটনা প্রকাশ্যে আসার পর ভারত সরকার কূটনৈতিক পর্যায়ে রাশিয়ার সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগ শুরু করে। সরকারের ধারাবাহিক প্রচেষ্টার ফলে এখন পর্যন্ত ১৩৯ জন ভারতীয় নাগরিককে মুক্ত করে দেশে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে। তবে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সরকারি মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল জানিয়েছেন, আরও প্রায় ২৪ জন ভারতীয় এখনো রুশ সেনাবাহিনীতে রয়েছেন বলে জানা গেছে এবং তাদের নিরাপদ প্রত্যাবর্তনের জন্য ভারত সরকার রাশিয়ার সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ বজায় রেখেছে।

ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সরকারি মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল একজন জ্যেষ্ঠ ভারতীয় পররাষ্ট্রসেবা (আইএফএস) কর্মকর্তা। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, বিদেশনীতি এবং বিদেশে অবস্থানরত ভারতীয় নাগরিকদের বিষয়ে সরকারের অবস্থান সংবাদমাধ্যমের সামনে তিনিই নিয়মিত তুলে ধরেন। সাম্প্রতিক এক ব্রিফিংয়ে তিনি জানান, বিদেশে চাকরির নামে অসাধু ব্যক্তি বা সংস্থার প্রলোভনে পা না দেওয়ার জন্য সরকার বারবার নাগরিকদের সতর্ক করে আসছে।

তদন্তে উঠে এসেছে, রাশিয়ার সেনাবাহিনীতে যুক্ত হওয়া অধিকাংশ ভারতীয় স্বেচ্ছায় সেখানে যাননি। বিভিন্ন রাজ্যে সক্রিয় কিছু দালাল ও মানবপাচারকারী চক্র বিদেশে নিরাপত্তারক্ষী, নির্মাণশ্রমিক, হোটেলকর্মী, রান্নার কর্মী বা সহকারী পদে মোটা বেতনের চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে বহু তরুণকে রাশিয়ায় পাঠায়। অনেকের কাছ থেকে কয়েক লাখ টাকা পর্যন্ত নেওয়া হয়। তাদের আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল, সেখানে সহজ কাজ, ভালো বেতন এবং উন্নত ভবিষ্যৎ অপেক্ষা করছে।

কিন্তু রাশিয়ায় পৌঁছানোর পর বাস্তবতা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। অনেকের অভিযোগ, তাদের সামরিক প্রশিক্ষণ দেওয়া হয় এবং রুশ ভাষায় লেখা চুক্তিপত্রে স্বাক্ষর করতে বাধ্য করা হয়, যার বিষয়বস্তু তারা বুঝতে পারেননি। কারও কারও পাসপোর্টও নিয়ে নেওয়া হয়। পরে তাদের ইউক্রেন সীমান্তবর্তী যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানো হয়, যেখানে বাঙ্কার নির্মাণ, রসদ পরিবহন, নিরাপত্তা দায়িত্বসহ বিভিন্ন সামরিক সহায়ক কাজে নিয়োজিত করা হয়। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, কয়েকজন ভারতীয় সরাসরি সংঘর্ষপূর্ণ এলাকাতেও কাজ করতে বাধ্য হন।

এই ঘটনায় কয়েকজন ভারতীয় নাগরিক প্রাণও হারিয়েছেন। তাদের মৃত্যুর পর ভারত সরকার রাশিয়ার সঙ্গে যোগাযোগ করে মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করে। একই সঙ্গে আটকে পড়া নাগরিকদের শনাক্ত করে নিরাপদে দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য মস্কোস্থ ভারতীয় দূতাবাস এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ধারাবাহিকভাবে কাজ করে যাচ্ছে।

ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসার পর ভারতের কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থা (সিবিআই) এবং অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থা মানবপাচার ও ভুয়া বিদেশি চাকরির নেটওয়ার্কের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করে। বিভিন্ন শহরে অভিযান চালিয়ে একাধিক ব্যক্তি ও সংস্থার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়। তদন্তে জানা যায়, ইউটিউব, টেলিগ্রাম, ফেসবুক ও হোয়াটসঅ্যাপের মতো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে বিদেশে উচ্চ বেতনের চাকরির বিজ্ঞাপন ছড়িয়ে মানুষকে প্রতারণার ফাঁদে ফেলা হতো।

২০২৪ সালে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর রাশিয়া সফরেও বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে আলোচিত হয়। রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে বৈঠকে ভারতীয় নাগরিকদের মুক্তির বিষয়টি উত্থাপন করেন তিনি। এরপর দুই দেশের কূটনৈতিক পর্যায়ে আলোচনার গতি বাড়ে এবং ধাপে ধাপে বহু ভারতীয়কে সেনাবাহিনীর দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দিয়ে দেশে ফেরার সুযোগ দেওয়া হয়।

সাম্প্রতিক ব্রিফিংয়ে রণধীর জয়সওয়াল বলেন, ভারত সরকার অবশিষ্ট ভারতীয়দের ফিরিয়ে আনতে রাশিয়ার সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছে। একই সঙ্গে তিনি নাগরিকদের উদ্দেশে সতর্কবার্তা দিয়ে বলেন, বিদেশে চাকরির নামে কোনো ব্যক্তি বা সংস্থার প্রস্তাব গ্রহণের আগে অবশ্যই সরকারি অনুমোদন, নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের সত্যতা এবং সংশ্লিষ্ট দেশের আইন ও ভিসা সংক্রান্ত নিয়ম যাচাই করা উচিত। অন্যথায় প্রতারণা ও মানবপাচারের শিকার হওয়ার ঝুঁকি থেকে যায়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, রাশিয়ার সেনাবাহিনীতে ভারতীয় নাগরিকদের যুক্ত হওয়ার এই ঘটনা শুধু একটি প্রতারণার কাহিনি নয়; এটি আন্তর্জাতিক মানবপাচার চক্রের কার্যক্রম, বিদেশে কর্মসংস্থানের নামে প্রতারণা এবং যুদ্ধকালীন পরিস্থিতির সুযোগ নেওয়ার একটি উদ্বেগজনক উদাহরণ। সরকারের কূটনৈতিক প্রচেষ্টায় অনেককে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হলেও, এই ঘটনা ভবিষ্যতে বিদেশে চাকরির প্রলোভনের বিষয়ে আরও সতর্ক থাকার প্রয়োজনীয়তাকে নতুন করে সামনে এনে দিয়েছে।

Loading