সোমালিয়া ওয়েব নিউজ: আজ জন্মাষ্টমী। চারপাশে উৎসবের আবহ। পাড়ায় পাড়ায়, এলাকায় এলাকায়, মন্দিরে মন্দিরে উচ্চারিত হচ্ছে হরিনাম। কোথাও কীর্তনের সুর, কোথাও শঙ্খধ্বনি, কোথাও আবার ভক্তদের কণ্ঠে—‘হরে কৃষ্ণ, হরে কৃষ্ণ, কৃষ্ণ কৃষ্ণ, হরে হরে’। শুধু ভারতবর্ষেই নয়, বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে আজ ভক্তিভরে স্মরণ করা হচ্ছে ভগবান শ্রীকৃষ্ণকে। সনাতন ধর্মের অন্যতম পবিত্র এই তিথিতে যেন ভক্তি, বিশ্বাস আর আধ্যাত্মিকতার এক অপূর্ব মিলন ঘটে।
পৌরাণিক কাহিনি অনুযায়ী, দ্বাপর যুগে মথুরার অত্যাচারী রাজা কংসের কারাগারে দেবকী ও বসুদেবের অষ্টম সন্তান হিসেবে আবির্ভূত হন শ্রীকৃষ্ণ। ভবিষ্যদ্বাণী ছিল—দেবকীর অষ্টম সন্তানই কংসের মৃত্যুর কারণ হবে। সেই আশঙ্কায় কংস দেবকী ও বসুদেবকে কারারুদ্ধ করেন এবং তাঁদের সন্তানদের একে একে হত্যা করতে থাকেন। কিন্তু অষ্টম সন্তান কৃষ্ণের জন্মের সময় ঘটে এক অলৌকিক ঘটনা। গভীর অন্ধকার রাত, চারদিকে ঝড়-বৃষ্টি, আর সেই মুহূর্তেই কারাগারে আবির্ভূত হন পরমেশ্বর শ্রীকৃষ্ণ।
শাস্ত্রকথা অনুসারে, কৃষ্ণের আবির্ভাবের পর কারাগারের প্রহরীরা গভীর নিদ্রায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়েন এবং কারাগারের দরজা আপনাআপনি খুলে যায়। পিতা বসুদেব শিশুকৃষ্ণকে মাথায় নিয়ে যমুনা পেরিয়ে গোকুলে পৌঁছে দেন। সেখানে নন্দ ও যশোদার ঘরে কৃষ্ণকে রেখে, তাঁদের সদ্যোজাত কন্যাকে সঙ্গে নিয়ে ফিরে আসেন মথুরায়। এভাবেই শুরু হয় ভগবান শ্রীকৃষ্ণের লীলাময় জীবনের এক নতুন অধ্যায়।
গোকুলের মাটিতে বেড়ে ওঠা সেই কৃষ্ণ কখনও মাখনচোর, কখনও গোপাল, কখনও রাখালরাজা। তাঁর বাঁশির সুরে মুগ্ধ হয়েছে বৃন্দাবন, তাঁর লীলায় ভক্তি পেয়েছে নতুন অর্থ। আবার অন্যদিকে, অত্যাচার ও অধর্মের বিরুদ্ধে তিনি হয়ে উঠেছেন ন্যায় ও ধর্ম প্রতিষ্ঠার প্রতীক।
শ্রীকৃষ্ণের জীবনকাহিনি শুধু একটি পৌরাণিক আখ্যান নয়—এর মধ্যে রয়েছে গভীর আধ্যাত্মিক দর্শন। মহাভারতের কুরুক্ষেত্রের রণাঙ্গনে অর্জুন যখন নিজের কর্তব্য নিয়ে দ্বিধাগ্রস্ত, তখন শ্রীকৃষ্ণ তাঁকে যে জ্ঞান দেন, তারই মর্মবাণী গীতায় প্রতিফলিত হয়েছে। কর্ম, কর্তব্য, আত্মজ্ঞান এবং ঈশ্বরের প্রতি সমর্পণের সেই শিক্ষা আজও মানুষের জীবনের পথপ্রদর্শক।
জন্মাষ্টমীর অন্যতম গভীর বার্তা তাই—অন্ধকার যত গভীরই হোক, আলোর আবির্ভাব অবশ্যম্ভাবী। অধর্ম যত শক্তিশালীই মনে হোক, ধর্মের প্রতিষ্ঠা একদিন হবেই। মানুষের অন্তরের অন্ধকার, অহংকার, লোভ, হিংসা ও অন্যায়কে দূরে সরিয়ে সত্য, প্রেম, করুণা ও ন্যায়ের পথে এগিয়ে যাওয়ার আহ্বানই যেন বহন করে এই পবিত্র তিথি।
আজ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে উপবাস, পূজা, নামসংকীর্তন, ভাগবত পাঠ, গীতাপাঠ এবং মধ্যরাতে কৃষ্ণের জন্মক্ষণ উদযাপনের আয়োজন চলছে। কোথাও সাজানো হয়েছে কৃষ্ণের দোলনা, কোথাও তৈরি হয়েছে গোকুল-বৃন্দাবনের আবহ। ছোট ছোট শিশুদের কৃষ্ণ ও রাধার সাজে সাজিয়ে তোলা হচ্ছে। মন্দির থেকে ভেসে আসছে ঘণ্টা, শঙ্খ আর কীর্তনের ধ্বনি।
কৃষ্ণের জন্মের সেই পবিত্র মুহূর্ত স্মরণ করে মধ্যরাতে যখন মন্দিরে ধ্বনিত হয় শঙ্খ, বাজে ঘণ্টা, আর ভক্তদের কণ্ঠে ওঠে ‘হরে কৃষ্ণ’ ধ্বনি—তখন যেন কয়েক হাজার বছরের পুরনো সেই আধ্যাত্মিক অনুভূতিই নতুন করে ফিরে আসে।
জন্মাষ্টমী তাই শুধুমাত্র একটি ধর্মীয় উৎসব নয়। এটি বিশ্বাসের উৎসব, প্রেমের উৎসব, ভক্তির উৎসব। এটি মনে করিয়ে দেয়—জীবনের যত প্রতিকূলতাই আসুক, সত্য ও ধর্মের পথ থেকে বিচ্যুত না হয়ে এগিয়ে চলাই মানুষের প্রকৃত কর্তব্য।
আজ জন্মাষ্টমীর এই পবিত্র দিনে তাই একটাই প্রার্থনা—অশুভ শক্তির বিনাশ হোক, শুভবুদ্ধির উদয় হোক, মানুষের হৃদয়ে প্রতিষ্ঠিত হোক প্রেম, শান্তি, সম্প্রীতি ও মানবিকতা।

![]()

More Stories
বাংলাদেশে সংখ্যালঘু নির্যাতন বন্ধের দাবি, কলকাতায় চার সংগঠনের সাংবাদিক বৈঠক
আজাদ হিন্দ ফৌজ: ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের এক গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়
নিট প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগে ছাত্র বিক্ষোভ: সমস্ত এফআইআর বন্ধের নির্দেশ সুপ্রিম কোর্টের