September 20, 2026

বাংলা ভাষার মর্যাদার প্রশ্নে আত্মত্যাগ—রাজেশ ও তাপসের স্মৃতিতে আজও ফিরে আসে দাড়িভিটের সেই দিন

সোমালিয়া ওয়েব নিউজ: ভাষা শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়, ভাষার সঙ্গে জড়িয়ে থাকে মানুষের পরিচয়, সংস্কৃতি, আবেগ এবং আত্মমর্যাদা। মাতৃভাষার অধিকার রক্ষার ইতিহাসে একুশে ফেব্রুয়ারির আত্মত্যাগ যেমন বাঙালির স্মৃতিতে অমর, তেমনই পশ্চিমবঙ্গের দাড়িভিটের ঘটনাও ভাষা ও শিক্ষার প্রশ্নে আন্দোলনের এক বেদনাবিধুর অধ্যায় হয়ে রয়েছে।

২০১৮ সালের ২০ সেপ্টেম্বর। উত্তর দিনাজপুরের ইসলামপুরের দাড়িভিট উচ্চ বিদ্যালয়কে ঘিরে উত্তেজনা ছড়ায় শিক্ষক নিয়োগকে কেন্দ্র করে। সমসাময়িক সংবাদ প্রতিবেদনে বলা হয়, স্কুলে উর্দু ও সংস্কৃত শিক্ষক নিয়োগের বিরোধিতা করে ছাত্র ও স্থানীয়রা আন্দোলনে নামে এবং বাংলা, বিজ্ঞান ও অন্যান্য বিষয়ে শিক্ষক নিয়োগের দাবি ওঠে। পরিস্থিতি পরে পুলিশ ও আন্দোলনকারীদের সংঘর্ষে গড়ায়।

সেই সংঘর্ষে গুলিবিদ্ধ হয়ে মৃত্যু হয় রাজেশ সরকার ও তাপস বর্মণের। রাজেশকে ইসলামপুর মহকুমা হাসপাতালে মৃত ঘোষণা করা হয় এবং তাপস পরে হাসপাতালে মারা যান। তাঁদের মৃত্যুকে ঘিরে তৎকালীন সময়ে তীব্র বিতর্ক তৈরি হয়। স্থানীয় ও পরিবারের পক্ষ থেকে পুলিশের গুলির অভিযোগ তোলা হলেও উত্তর দিনাজপুরের তৎকালীন পুলিশ সুপার পুলিশ গুলি চালানোর কথা অস্বীকার করেছিলেন।

ঘটনার পর রাজেশ ও তাপসের পরিবার তদন্তের দাবি তোলে। এমনকি শেষকৃত্য না করে তাঁদের দেহ সমাধিস্থ করে রাখা হয়েছিল, যাতে প্রয়োজনে পুনরায় ময়নাতদন্ত করা যায় এবং তদন্তের মাধ্যমে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ সামনে আসে।

এই ঘটনাকে ঘিরে পরবর্তীকালে আইনি প্রক্রিয়াও দীর্ঘ হয়। ২০২৩ সালে কলকাতা হাইকোর্ট দাড়িভিটে দুই যুবকের মৃত্যুর ঘটনায় জাতীয় তদন্তকারী সংস্থা (NIA)-কে তদন্তের নির্দেশ দেয়। আদালতের নথিতে বলা হয়েছে, রাজেশ ও তাপস গুলিবিদ্ধ হয়েছিলেন এবং তাঁদের মৃত্যুকে ঘিরে পুলিশের গুলি চালানোর অভিযোগ ও পুলিশের পাল্টা বক্তব্য—দুই দিকই তদন্তের বিষয় হয়ে উঠেছিল।

রাজেশ ও তাপসের স্মরণ তাই শুধুমাত্র একটি রাজনৈতিক বিতর্কের বিষয় নয়—এটি ভাষা, শিক্ষা এবং ছাত্রসমাজের প্রশ্নকে ঘিরে তৈরি হওয়া এক মর্মান্তিক ঘটনার স্মৃতি। তাঁদের পরিবার যে শোকের মধ্য দিয়ে গিয়েছে, সেই শোকের মূল্য কোনও রাজনৈতিক পরিচয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।

মাতৃভাষার প্রতি ভালোবাসা যদি সত্যিই হৃদয়ের বিষয় হয়, তাহলে ভাষার দাবিতে প্রাণ হারানো প্রতিটি মানুষের স্মৃতির প্রতিই সংবেদনশীল থাকা জরুরি। ভাষার মর্যাদা রক্ষা মানে অন্য ভাষাকে ঘৃণা করা নয়; বরং নিজের মাতৃভাষায় শিক্ষা, সংস্কৃতি ও আত্মপরিচয়ের অধিকারকে সম্মান করা এবং একই সঙ্গে অন্য ভাষাভাষীর অধিকারকেও মর্যাদা দেওয়া।

একুশের ভাষাশহিদদের স্মৃতি যেমন বাঙালিকে বারবার মাতৃভাষার কথা মনে করিয়ে দেয়, তেমনই দাড়িভিটের রাজেশ ও তাপসের স্মৃতিও মনে করিয়ে দেয়—ভাষা ও শিক্ষার প্রশ্নে কোনও তরুণের জীবন যেন আর কখনও এমন সংঘাতের বলি না হয়।

কারণ ভাষার ইতিহাস কেবল অক্ষর, ব্যাকরণ কিংবা স্লোগানের ইতিহাস নয়।
ভাষার ইতিহাসের পাতায় লেখা থাকে মানুষের ভালোবাসা, প্রতিবাদ, অশ্রু—কখনও কখনও রক্তের অক্ষরেও।

Oplus_16908288

Loading