October 2, 2026

নিজের আয়ের ৭৫ শতাংশ পথকুকুরদের জন্য, ছয় বছর ধরে নীরব লড়াই সুজাতা গাঙ্গুলীর

সোমালিয়া ওয়েব নিউজ: দিনভর নিজের পার্লারে কাজ। সেখান থেকে যে আয়, তার একটা বড় অংশ নিজের সংসারের জন্য নয়—খরচ হয় রাস্তার অসহায় প্রাণগুলোর জন্য। গত ছয় বছর ধরে এভাবেই নিজের জীবনের একটা বড় অংশ পথকুকুরদের জন্য উৎসর্গ করে চলেছেন সুজাতা গাঙ্গুলী।

রোদ হোক, বৃষ্টি হোক কিংবা শরীর খারাপ—সময় হলেই স্কুটি নিয়ে বেরিয়ে পড়েন তিনি। সঙ্গে থাকে বালতি ভর্তি রান্না করা খাবার আর একাধিক পাত্র। গন্তব্য শহরের বিভিন্ন প্রান্ত। আরামবাগ পৌরসভার সামনে, ছায়াবানী সিনেমা হলের সামনে, পোস্ট অফিস চত্বর, বাজার, কোটপাড়া-সহ একাধিক জায়গায় প্রতিদিন প্রায় ৮০টি পথকুকুরকে খাবার খাওয়ান তিনি।

প্রতিদিন রাতের খাবারের জন্য প্রায় সাত কেজি চাল এবং তিন থেকে চার কেজি মাংস রান্না করা হয়। নিজের হাতে সেই খাবার নিয়ে স্কুটিতে করে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় পৌঁছে যান সুজাতা। প্রত্যেকটি কুকুরের জন্য আলাদা পাত্র সঙ্গে রাখেন। মাটিতে পাত্র পেতে তবেই খাবার পরিবেশন করেন। তাঁর কাছে তারা শুধুই রাস্তার কুকুর নয়—প্রতিটি প্রাণ যেন তাঁর নিজের সন্তানের মতো।

সুজাতাকে দেখলেই দূর থেকে ছুটে আসে পরিচিত মুখগুলি। কেউ লেজ নাড়ে, কেউ তাঁর চারপাশে ঘুরতে থাকে। কেউ আবার আদরের আশায় শরীর ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকে। দীর্ঘদিনের এই সম্পর্কের কারণে মানুষটির পায়ের শব্দও যেন চিনে নিয়েছে তারা।

কিন্তু এই ভালোবাসার পথ কখনও মসৃণ ছিল না। কুকুরদের খাবার খাওয়ানোকে কেন্দ্র করে স্থানীয় মানুষের একাংশের বিরোধিতার মুখে পড়তে হয়েছে তাঁকে। অভিযোগ, তাঁকে গালিগালাজ করা হয়েছে, এমনকী চুলের মুঠি ধরে মারধরও করা হয়েছে। স্থানীয়দের একাংশের অভিযোগ, তাঁর খাবার দেওয়ার কারণেই এলাকায় পথকুকুরের সংখ্যা বাড়ছে।

তারপরও থামেননি সুজাতা। বরং মানুষের বিরোধিতা, অপমান কিংবা ভয়—কোনও কিছুই তাঁর প্রতিদিনের নিয়ম বদলাতে পারেনি। যে প্রাণীগুলি মানুষের ওপর নির্ভর করে রাস্তার ধারে বেঁচে থাকে, তাদের জন্য রাতের খাবার নিয়ে বেরিয়ে পড়া তাঁর কাছে এখন আর কোনও বিশেষ কাজ নয়, জীবনেরই অংশ।

তবে এই ভালোবাসার পথেও রয়েছে ঝুঁকি। পথকুকুরদের নিয়ে কাজ করতে গিয়ে নিজেই সাত-আটবার আক্রান্ত হয়েছেন সুজাতা। নিতে হয়েছে জলাতঙ্ক প্রতিরোধী টিকাও। তবুও তাঁর কথায়, ভয় পেলেই যদি পিছিয়ে যান, তাহলে এই প্রাণীগুলির পাশে দাঁড়াবে কে?

তবে পশুপ্রেমীদের পাশাপাশি সচেতন নাগরিকদের একাংশের বক্তব্য, পথকুকুরদের প্রতি সহানুভূতি যেমন প্রয়োজন, তেমনই প্রয়োজন দায়িত্বশীল ব্যবস্থাপনা। নিয়মিত জলাতঙ্কের টিকাকরণ এবং নির্বীজকরণ বা জন্মনিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির মাধ্যমে পথকুকুরের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি। একই সঙ্গে স্থানীয় প্রশাসন, পশুপ্রেমী সংগঠন এবং নাগরিকদের সমন্বয় থাকলে মানুষ ও পথকুকুর—দুই পক্ষেরই নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব।

সুজাতার গল্প তাই শুধু একজন পশুপ্রেমী মহিলার গল্প নয়। এটি মানুষের সহমর্মিতা, প্রতিবাদ সহ্য করার ক্ষমতা এবং নিজের বিশ্বাসের প্রতি দায়বদ্ধতার গল্প। নিজের উপার্জনের ৭৫ শতাংশ পর্যন্ত খরচ করে যে মানুষটি প্রতিদিন প্রায় ৮০টি প্রাণীর মুখে খাবার তুলে দেন, তাঁর কাছে হয়তো এই কাজ কোনও মহান কাজ নয়। কিন্তু সেই প্রাণীগুলির কাছে সুজাতা মানেই রাতের অন্ধকারে ভেসে আসা একটি পরিচিত স্কুটির শব্দ, খাবারের গন্ধ আর নিরাপত্তার আশ্বাস।

 সুজাতাকে দেখলে ছুটে এসে তারা ঘিরে ধরে। কারণ তারা জানে—এই মানুষটি তাদের তাড়াতে আসেননি, এসেছেন খাওয়াতে। আর তাই ছয় বছর ধরে প্রতিরাতের সেই যাত্রা থামেনি।

রোদ-বৃষ্টি, অপমান, মারধর, এমনকি নিজের শরীরে আঘাতের স্মৃতিও তাঁকে থামাতে পারেনি। তাঁর হাতে খাবারের পাত্র, সামনে অপেক্ষারত কয়েক ডজন অসহায় প্রাণ—এই নিয়েই চলছে সুজাতা গাঙ্গুলীর নীরব লড়াই।

হয়তো শহরের কোলাহলে তাঁর এই কাজ খুব বেশি শব্দ তৈরি করে না। কিন্তু প্রতিদিন রাতে যখন কোনও ক্ষুধার্ত পথকুকুর তাঁর দেওয়া খাবারের পাত্রের সামনে বসে খেতে শুরু করে, তখন সেই নীরব মুহূর্তেই তৈরি হয় মানবিকতার এক অন্য গল্প।

Loading