February 4, 2026

সামাজিক বাধা অতিক্রম করে কাঁধে ঢাক তুলে নিয়েছেন মহিলারা

সোমালিয়া সংবাদ, আরামবাগ: অসুরকে নিধন করতে দশ হাতে অস্ত্র তুলে নিয়েছিলেন মা দুর্গা। আর সংসারের দারিদ্র নামক অসুরকে মোকাবিলা করার জন্য দু’হাতে ঢাকের কাঠি তুলে নিয়েছেন দুঃস্থ পরিবারের একদল মহিলা। শুধু একটাই উদ্দেশ্য, পরিবারের বৃদ্ধ বাবা-মা আর ছোট ছোট বাচ্চাগুলোর মুখে হাসি ফোটানো। আর তাই প্রতিদিন নিয়ম করে আরামবাগের সালেপুর অঞ্চলের রামনগর সংলগ্ন দ্বারকেশ্বর নদের পাড়ে নিয়মিত তালিম নিচ্ছেন। আর প্রশিক্ষক হিসেবে উপস্থিত থাকছেন আর এক ঢাকি দিলীপ কুমার দাস। দিলীপবাবু আরামবাগ বিডিও অফিসের কর্মী। তাই শনি-রবি ও ছুটির দিন দু’বেলা তিনি সালেপুর, রামনগর, গির্জাতলা ও পার্বতীচক এলাকার ১৩ জন মহিলাকে এই তালিম দিচ্ছেন। পুজোর দিনের ঘট উত্তোলন থেকে শুরু করে বিসর্জন পর্যন্ত কিভাবে কোন্ দিন নাচের তালে ঢাক বাজাতে হবে সেসব শেখাচ্ছেন। পায়ের ছন্দ সুরের মূর্ছনায় কিভাবে আন্দোলিত হবে প্রতিনিয়ত তার পাঠ গ্রহণ করছেন এলাকার এই তপশিলি জাতি ও উপজাতি সম্প্রদায়ের চম্পা মল্লিক, বুলটি মান্ডি, শ্যামলী হাঁসদা, সুমিত্রা মুর্মুরা।  শ্যামলী হাঁসদা জানালেন, ছেলেমেয়ে  এবং স্বামীদের জন্য ভোরবেলা উঠে রান্নাবান্না শেষ করতে হয়। তারপর ঢাকের তালিম নেওয়ার পালা চলে। সামনেই পুজো। বিভিন্ন পুজোমন্ডপে ঢাক বাজতে যাব। তাই খুব আনন্দ হচ্ছে। এই দলে প্রথম যোগ দিয়েছিলেন চম্পা মল্লিক। তিনি বলেন, প্রথমে সবাই হাসাহাসি করত। অন্যেরা কেউ ঢাক বাজাতে চাইতো না। অনেক বুঝিয়ে পরিবারের লোকেদের রাজি করিয়ে একজন একজন করে এখন ১৩ জন হয়েছি। নাম দিয়েছি  ‘কালীমাতা মহিলা ঢাক পার্টি’। গত দু’বছর লকডাউনে তেমন ভাবে বায়না পাইনি। এ বছর বেশ কয়েকটা বায়না হয়েছে। খুব ভাল লাগছে। যদিও এখনও তাঁদের এই ঢাক বাজানো অনেকেই মেনে নিতে পারেনি। বুলটি মান্ডি বলেন, কথা শুনতে হয় সব সময়। ফিরতে রাত হয়ে গেলে নানান কৈফিয়ৎ দিতে হয়। আসলে স্বামীর উপার্জনে ভালভাবে সংসার চালানো সম্ভব হয় না। তাই কিছুটা যদি সহায়তা করতে পারি তাই আমরা এই পেশায় এসেছি। খুব ভাল লাগছে। ঘরে বসে না থেকে সংসারের জন্য দুটো অর্থ তুলে দিতে পারছি। এর থেকে ভাল আর কি হতে পারে। প্রশিক্ষক দিলীপ কুমার দাস বললেন, এই সমস্ত পরিবারগুলোর পুরুষেরা বেশিরভাগ মদ খেয়ে অনেক টাকা নষ্ট করে ফেলে। ফলে সংসারগুলোর আর্থিক অবস্থা খুবই খারাপ। তাই ওদের মহিলাদের দুরবস্থার কথা ভেবেই ওদেরকে এই ঢাক বাজানোর পথে নিয়ে এসেছি। প্রথম প্রথম অনেক বাধার সম্মুখীন হতে হয়েছিল। কিন্তু এখন বাড়ির পুরুষরাও মেয়েদেরকে ঢাক বাজাতে উৎসাহিত করেন। এটা খুব ভাল লাগছে। এর জন্য আমি সত্যিই গর্বিত। তিনি আরও বলেন, এবার দুর্গাপুজোয় তিনটি পুজো মন্ডপে বাজানোর জন্য বায়না পেয়েছি। খুব ভাল লাগছে। আর তিনটি  পুজোমন্ডপই মহিলাদের দ্বারা পরিচালিত। তাই ওরা ওই সমস্ত মণ্ডপে বাজানোর জন্য এখন থেকে উৎসুক হয়ে রয়েছে।

Loading