November 30, 2025

সংগ্রাম থেকে সাফল্যের পথে— আরামবাগের মাটি থেকে উঠে আসা স্বপন নন্দীর লড়াইয়ের কাহিনি

রাজনীতি, মানবিকতা ও সাহসিকতার মেলবন্ধন তাঁর জীবনের মূলধারা

সোমালিয়া ওয়েব নিউজ :
রাজনীতি তাঁর কাছে ছিল শুধু পেশা নয়, ছিল এক নেশা— মানুষের পাশে দাঁড়ানোর অদম্য ইচ্ছে। আর তাই জীবনের প্রতিটি বাঁকে সংগ্রামকে সঙ্গী করেই আজও জনমানুষের সেবায় নিবেদিত স্বপন নন্দী।

মায়াপুর অঞ্চলের প্রত্যন্ত গ্রাম বলুন্ডি তাঁর জন্মভূমি। দাদু ঈশ্বর মাখনলাল নন্দী ছিলেন সেই সময়ের প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী ও গ্রামের মোড়ল। পিতা ঈশ্বর কেনারাম নন্দী-র কাছ থেকে তিনি পেয়েছিলেন নীতিবোধ ও সামাজিক দায়িত্ববোধের শিক্ষা। গ্রামের রাস্তাঘাট ও পরিকাঠামোর দুরবস্থা দেখে অল্প বয়সেই রাজনীতির প্রতি আকৃষ্ট হন স্বপন বাবু।

রাজনীতির সূচনা— নির্দল প্রার্থী থেকে কংগ্রেসের কর্মযোদ্ধা

১৯৭৮ সালে প্রথম পঞ্চায়েত নির্বাচনে তিনি নির্দল প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন এবং তখনকার কংগ্রেস নেতা কৃষ্ণ রায়কে সমর্থন করেন। রাজনৈতিক জীবন শুরু কংগ্রেস পরিবারেই।
১৯৮৩ সালে তিনি কংগ্রেসের পক্ষ থেকে পঞ্চায়েত সমিতির কৃষি কর্মাধ্যক্ষ হন।
১৯৮৮ সালে ত্রিস্তর পঞ্চায়েত ব্যবস্থায় নির্বাচিত হয়ে তিনি হন পঞ্চায়েত সমিতির বিরোধী দলনেতা

রাজনীতির প্রথম দিকেই তাঁর পরিচয় হয় তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী প্রফুল্ল চন্দ্র সেন-এর সঙ্গে। প্রফুল্লবাবুর জন্মদিন উপলক্ষে মায়াপুর কল্যাণ কেন্দ্রে অনুষ্ঠানে অংশ নিতে গিয়ে রাজনৈতিক জীবনের গভীর সংযোগ তৈরি হয় তাঁর।

ফুটবল মাঠ থেকে রাজনীতির ময়দান

ছাত্রজীবনে তিনি ছিলেন দক্ষ গোলকিপার। যেমন সাহস নিয়ে গোলপোস্ট রক্ষা করতেন, তেমনি দৃঢ় মনোবল নিয়ে রাজনীতিতেও লড়ে গেছেন বারবার।
নেতাজি মহাবিদ্যালয় থেকে ১৯৮১-৮২ সালে বাণিজ্য বিভাগে স্নাতক হন। কলেজে পড়াকালীন ছাত্র পরিষদ করতেন এবং বিভিন্ন নির্বাচনে বুথ এজেন্ট হিসেবেও দায়িত্ব পালন করতেন।

বাম আমলের রক্তচক্ষু ও মৃত্যুর মুখ থেকে বারবার ফিরে আসা

স্বপন নন্দীর রাজনৈতিক জীবন কখনই মসৃণ ছিল না। বামফ্রন্ট আমলে তাঁর উপর নেমে আসে একের পর এক হামলা ও অত্যাচার। তিনি নিজেই জানিয়েছেন,

“জমি থেকে ফসল কেটে বাড়িতে আনা যেত না, বামেদের ভয়ে মানুষ মাঠে যেতে সাহস করত না।”

তেলেভেলো কালীমন্দিরের কাছে এক রাতে তাঁর উপর সশস্ত্র আক্রমণ হয়। মৃত্যুর মুখ থেকে প্রাণ বাঁচিয়ে কাদা-পানিতে হেঁটে নলবন হয়ে আরামবাগ, সেখান থেকে বাস ধরে কলকাতায় আশ্রয় নেন। নিজের ভাষায়, “৩৭ থেকে ৩৮ বার মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরেছি”— এই লড়াই তাঁকে আরও দৃঢ় করেছে।

তৃণমূল কংগ্রেসে যোগদান ও নতুন অধ্যায়

১৯৯৮ সালে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তৃণমূল কংগ্রেস গঠনের পর স্বপন বাবু তাঁর নেতৃত্বে যোগ দেন। এরপর থেকেই শুরু হয় এক নতুন সংগ্রাম।
২০০২ সালে আরামবাগে রাজনৈতিক সংঘর্ষে রক্তাক্ত হন তিনি; দুদিন অচৈতন্য অবস্থায় ছিলেন। সেই সময় তৎকালীন মন্ত্রী মদন মিত্রের সাহায্যে কলকাতার পিজি হাসপাতালে ভর্তি হন।
মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁকে দেখতে হাসপাতালে আসেন এবং আশীর্বাদ করেন। এমনকি রক্তাক্ত জামাকাপড় দেখে তিনি নিজ হাতে নতুন পোশাক কিনে দেন— যা স্বপন নন্দী আজও স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে সযত্নে রেখে দিয়েছেন। বর্তমানে তিনি রাজ্য কমিটির সম্পাদক।

স্ত্রীর রাজনৈতিক লড়াই ও পারিবারিক সাহসিকতা

২০০৬ সালে বামফ্রন্টের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে স্বপনবাবুর স্ত্রী তৃণমূলের হয়ে বিধানসভা নির্বাচনে প্রার্থী হন। যদিও জয় পাননি, তবে আরামবাগে তৃণমূলের অবস্থান মজবুত করতে তাঁর ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ।

আরামবাগ পৌরসভার নেতৃত্বে উন্নয়নের অধ্যায়

২০১০ সালে পৌরসভা নির্বাচনে তৃণমূলের প্রার্থী হিসেবে দাঁড়িয়ে স্বপন নন্দী হন বিরোধী দলনেতা
২০১৩-১৪ সালে তিনি নির্বাচিত হন আরামবাগ পৌরসভার চেয়ারম্যান হিসেবে।
দু’বার পৌরসভার অ্যাডমিনিস্ট্রেটর হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর আমলে আরামবাগে রাস্তা, পানীয়জল, আলো ও বাজার উন্নয়ন প্রকল্পে উল্লেখযোগ্য কাজ হয়েছে।বর্তমানে তিনি আরামবাগের কাউন্সিলের ও রাজ্য কমিটির সম্পাদক।

তিনি বলেন,

“মানুষের সমস্যার কাছে আমি রাজনীতির চেয়ে মানবিকতাকে বড় মনে করি। তাই চেয়ারম্যান থাকলেও সাইকেলে চড়ে ওয়ার্ডে ঘুরে বেড়িয়েছি, রিক্সায় মাইক নিয়ে প্রচারে গিয়েছি।”

মামলার পাহাড়, তবুও অবিচল সংগ্রামী

রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণে একসময় তাঁর নামে ৬০-৬৫টি মামলা ছিল। বর্তমানে তা কমে দাঁড়িয়েছে ১৫-২০-এ। কিন্তু কখনও পিছপা হননি।

মানুষের মানুষ স্বপন নন্দী

রাজনীতির বাইরে তিনি একজন সামাজিক কর্মী ও মানবসেবী হিসেবেও সমানভাবে পরিচিত। অসহায় পরিবারকে সাহায্য করা, চিকিৎসা খরচ বহন করা, স্কুল-মন্দির মেরামতের উদ্যোগ— সবেতেই তিনি সর্বাগ্রে।
তৃণমূলের কর্মীরা যেখানেই আক্রান্ত, সেখানেই প্রথমে পৌঁছে যান তিনি।

আজও আরামবাগের মানুষ তাঁকে শুধু নেতা হিসেবে নয়, “নিজেদের মানুষ” বলে মানেন।
স্বপন নন্দীর কথায়,

“বিধানচন্দ্র রায়ের পর বাংলার প্রকৃত রূপকার হলেন মাননীয়া মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর নেতৃত্বেই রাজ্যের উন্নয়ন সম্ভব হয়েছে।”

তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত স্বপন নন্দী আজও দলের একনিষ্ঠ সৈনিক, এবং সাধারণ মানুষের প্রিয় মুখ।

Loading