শারদীয়া নয়, এই বসন্তেই হয়েছিল দেবী দুর্গার প্রথম আরাধনা

সোমালিয়া ওয়েব নিউজঃ বসন্তের উষ্ণ হাওয়া, চারদিকে পলাশ আর কৃষ্ণচূড়ার লালিমা। ঠিক এই সময়েই যদি কানে ভেসে আসে ঢাকের শব্দ আর ধুনুচির গন্ধ, তবে অবাক হওয়ার কিছু নেই। কারণ এই সময়েই জেগে ওঠে বাংলার প্রাচীনতম দুর্গোৎসব— বাসন্তী পূজা।

বাঙালি মানেই শারদীয় দুর্গাপূজা-র আনন্দে মেতে ওঠা। কিন্তু শাস্ত্র মতে, শরৎকালের এই পূজা আসলে ‘অকাল বোধন’। দেবী দুর্গা-র মূল আরাধনার সময় বসন্তকালেই।

রাজা সুরথ ও প্রথম দুর্গাপূজার কাহিনি

বাসন্তী পূজার উল্লেখ পাওয়া যায় মার্কণ্ডেয় পুরাণ ও চণ্ডী-তে।

চিত্রগুপ্ত বংশীয় রাজা সুরথ ছিলেন এক পরাক্রমশালী শাসক। কিন্তু এক যুদ্ধে পরাজয়ের পর তাঁর নিজের সভাসদরাই তাঁকে বিশ্বাসঘাতকতা করে। সব হারিয়ে তিনি আশ্রয় নেন মেধা মুনির আশ্রমে।

সেখানে তাঁর সঙ্গে পরিচয় হয় ‘সমাধি’ নামের এক বৈশ্যের, যাকে তার পরিবারই ত্যাগ করেছিল। সব হারিয়েও দুজনেই সংসারের প্রতি মায়া ছাড়তে পারছিলেন না।

মেধা মুনি তাঁদের বোঝান— এ সবই মহামায়ার খেলা। তাঁর উপদেশে চৈত্র মাসের শুক্লপক্ষে তাঁরা কঠোর তপস্যা করেন। দেবীর আশীর্বাদ লাভ করে বসন্তকালেই তাঁরা প্রথম দুর্গাপূজা সম্পন্ন করেন।

পরে ত্রেতা যুগে রামচন্দ্র রাবণ বধের আগে শরৎকালে দেবীর আরাধনা করেন, যা ‘অকাল বোধন’ নামে পরিচিত হয়।

নবরাত্রি: ৯ দিনের আরাধনা

চৈত্র মাসের শুক্লপক্ষের প্রতিপদ থেকে শুরু হয় নবরাত্রি। এই নয় দিনে দেবীর নয়টি রূপের পূজা করা হয়—
শৈলপুত্রী, ব্রহ্মচারিণী, চন্দ্রঘণ্টা, কুষ্মাণ্ডা, স্কন্দমাতা, কাত্যায়নী, কালরাত্রি, মহাগৌরী ও সিদ্ধিদাত্রী।

বাসন্তী পূজার মূল আচার সপ্তমী থেকে নবমী পর্যন্ত—

  • ষষ্ঠী: অশোক ষষ্ঠী হিসেবে পালিত
  • অষ্টমী: দেবী অন্নপূর্ণার আরাধনা
  • নবমী: রামনবমী হিসেবে উদযাপন

দেবীর আগমন ও গমন বাহনের উপর নির্ভর করে বিভিন্ন ফলের পূর্বাভাস দেওয়া হয়— যেমন পালকি, গজ, ঘোড়া বা নৌকা।

ধর্মীয় তাৎপর্য ও বর্তমান উদযাপন

বাসন্তী পূজা শুধুমাত্র একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়, এটি বাঙালির ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির এক গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বসন্তের নবজাগরণে দেবীর আরাধনা জীবনের পুনর্জন্মের প্রতীক হিসেবে ধরা হয়।

আজ শারদীয় দুর্গাপূজা বেশি জনপ্রিয় হলেও, পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশের বহু বনেদি পরিবারে এখনও ঐতিহ্য মেনে বাসন্তী পূজা অনুষ্ঠিত হয়। বিশেষ করে ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, সিলেট ও খুলনার বিভিন্ন মন্দির ও বাড়িতে এই পূজা অত্যন্ত ভক্তিভরে পালিত হয়।

শরতের কাশফুলের পরিবর্তে বসন্তের রঙিন প্রকৃতিতে মায়ের আরাধনার রয়েছে এক অন্যরকম স্নিগ্ধতা।

Loading