চৈত্র শেষের নীলকণ্ঠ বন্দনা: গাজন ও চড়ক পূজার শাস্ত্রীয় ও লৌকিক মাহাত্ম্য

সোমালিয়া ওয়েব নিউজঃ বাংলার লোকসংস্কৃতির বিশাল ক্যানভাসে শিবের গাজনচড়ক হলো এমন এক আধ্যাত্মিক পর্যায়, যেখানে লৌকিক বিশ্বাস এবং শাস্ত্রীয় দর্শনের সীমারেখা একীভূত হয়ে যায়। শাস্ত্রীয় বিচারে চৈত্র মাস হলো সূর্যের উত্তরায়ণ গতির অন্তিম পর্যায়, যখন প্রকৃতিতে রুদ্ররোষ এবং সৃজনী শক্তির এক সন্ধিক্ষণ তৈরি হয়। এই সময়ে শিবের গাজন কেবল একটি উৎসব নয়, বরং এটি নাথ সম্প্রদায়, পাশুপত শৈব দর্শন এবং প্রাচীন তান্ত্রিক সাধনার এক জটিল ও রহস্যময় বহিঃপ্রকাশ। আধ্যাত্মিক দৃষ্টিতে গাজন হলো ‘জীব’ থেকে ‘শিব’ হওয়ার একটি পরীক্ষাগার। গাজনের মূল প্রবচন হলো ‘কায়াসাধনা’, যেখানে সন্ন্যাসীরা নিজেদের পার্থিব শরীরকে পরমাত্মার চরণে উৎসর্গ করেন। এই ব্রতের প্রতিটি স্তরই গূঢ় তত্ত্বে ঠাসা। গাজনের সন্ন্যাসী হওয়ার প্রথম ধাপ হলো উপবীত বা উত্তরীয় গ্রহণ, যা ব্যক্তির পুরাতন পরিচয়কে মুছে ফেলে তাঁকে এক অবধূত স্তরে উন্নীত করে। এখানে জাতপাত ও সামাজিক মর্যাদার কোনো স্থান নেই; ডোম, চণ্ডাল থেকে শুরু করে তথাকথিত উচ্চবর্ণ— সকলেই এই সময় মহাদেবের ‘পুত্র’ বা ‘গণ’ হিসেবে পরিচিত হন। এই সাম্যবাদই গাজনের আদি মাহাত্ম্য।

গাজনের পর্যায়ক্রমে দিন গাজনরাত গাজন দুই ভিন্ন আধ্যাত্মিক চেতনার প্রতীক। দিন গাজন হলো সূর্যের প্রখর তেজের সাথে নিজের ইচ্ছাশক্তিকে একীভূত করা। প্রখর রোদে নগ্নপদে গ্রাম পরিক্রমা এবং উচ্চস্বরে ‘বম বম মহাদেব’ ধ্বনি দেওয়া আসলে কুণ্ডলিনী শক্তির জাগরণী গান। অন্যদিকে, রাত গাজন হলো ঘোর তান্ত্রিক ও গুহ্য সাধনা। নিস্তব্ধ গভীর রাতে শ্মশান জাগরণ, মড়া নিয়ে নৃত্য (যা এখন অনেক জায়গায় প্রতীকী) এবং শিবের বিয়ের গান গাওয়ার মাধ্যমে সাধক বোঝাতে চান যে, মৃত্যু বা ধ্বংসই শেষ কথা নয়, বরং ধ্বংসের পরেই নতুন সৃষ্টির বীজ নিহিত থাকে। এই সময় সন্ন্যাসীরা যে হবিষ্যান্ন গ্রহণ করেন বা ভূমিশয্যা নেন, তা হলো পঞ্চেন্দ্রিয়কে বশ করার একটি প্রাচীন মনস্তাত্ত্বিক পদ্ধতি।

সবচেয়ে রোমহর্ষক ও আধ্যাত্মিকভাবে গূঢ় অংশটি হলো শরীরের ওপর অমানুষিক কষ্ট সহ্য করা। পাঠাতনের উপর পেরেক গেঁথে তার ওপর শুয়ে থাকা বা সন্ন্যাসীদের গড়াগড়ি দেওয়া আসলে যোগশাস্ত্রের ‘ধৃতি’ বা সহনশীলতার পরীক্ষা। শাস্ত্র মতে, যখন মন সম্পূর্ণভাবে ঈশ্বরে নিমগ্ন থাকে, তখন শরীরের স্নায়বিক বেদনা মস্তিষ্ক পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে না। বান ফোড়া বা জিহ্বা ও পিঠের চামড়া ফুঁড়ে লোহার শলাকা প্রবেশ করানো হলো আসক্তি বিনাশের প্রতীক। এই বান হলো ‘জ্ঞানবান’, যা অজ্ঞানতাকে বিদীর্ণ করে সত্যের সন্ধান দেয়। রক্তহীন এই প্রক্রিয়াটি তান্ত্রিক ‘মুদ্রা’র সাথে তুলনীয়, যেখানে শারীরিক যন্ত্রণা ভক্তির পরমানন্দে রূপান্তরিত হয়। ঝাঁপ ধরা বা উঁচু মাচা থেকে ধারালো অস্ত্রের ওপর ঝাঁপ দেওয়া হলো মহাকালের কাছে নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ; যেখানে ভক্ত বিশ্বাস করেন যে, সৃষ্টির নিয়ন্তা শিব স্বয়ং তাঁকে রক্ষা করবেন।

গাজনের চূড়ান্ত ক্লাইম্যাক্স হলো চড়ক পূজা। চড়ক গাছটি আধ্যাত্মিক দিক থেকে মানবদেহের ‘সুষুম্না নাড়ী’র প্রতীক। পিঠের চামড়ায় বড়শি গেঁথে যখন সন্ন্যাসী শূন্যে ঘুরতে থাকেন, তখন সেই ঘূর্ণনটি মহাজাগতিক কালচক্রের আবর্তনের সাথে একাত্ম হওয়ার ইঙ্গিত দেয়। এটি পৃথিবীর আবর্তন এবং মানুষের মুক্তি কামনার এক লৌকিক ছন্দ। শাস্ত্রে উল্লেখ আছে যে, মহাদেব যখন প্রলয় তান্ডব করেন, তখন সৃষ্টির ভারসাম্য রক্ষা করতে আদ্যাশক্তিকে আবির্ভূত হতে হয়। গাজনে এই পুরুষ ও প্রকৃতির মিলনকেই উদযাপন করা হয়। সন্ন্যাসীদের এই কৃচ্ছ্রসাধন কেবল নিজেদের মোক্ষের জন্য নয়, বরং ধরিত্রীর উর্বরতা বৃদ্ধি, অনাবৃষ্টি দূর করা এবং সমাজের আপামর মানুষের অমঙ্গল বিনাশের এক সামষ্টিক ত্যাগ। চৈত্র সংক্রান্তির মধ্যরাতে যখন গাজনের ডঙ্কা স্তিমিত হয়, তখন সেই ত্যাগের আগুনেই দগ্ধ হয় গত বছরের সমস্ত গ্লানি, আর নতুন বছরের সূর্য ওঠে এক শুদ্ধ ও পবিত্র আধ্যাত্মিক চেতনার আলো নিয়ে। গাজন তাই বাঙালির কাছে কেবল লোকজ উৎসব নয়, এটি দেহ ও আত্মার এক পরম অভিসার।

Loading