সংগ্রামের আগুনে গড়া এক কর্মীর জীবনগাথা: গোঘাটের অসিত কুন্ডুর রাজনৈতিক ও আদর্শিক পথচলা

সোমালিয়া ওয়েব নিউজ: হুগলি জেলার গোঘাটের বালিবেলা গ্রামের এক সাধারণ পরিবার থেকে উঠে আসা এক মানুষের দীর্ঘ সংগ্রাম, আদর্শের প্রতি অনড় বিশ্বাস এবং রাজনৈতিক জীবনের উত্থান-পতনের কাহিনি আজও অনেক কর্মীর কাছে অনুপ্রেরণা। তিনি অসিত কুন্ডু। প্রায় পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে রাষ্ট্রবাদ, হিন্দুত্ববাদী আদর্শ এবং সংগঠন গড়ার লড়াইয়ে নিজেকে নিবেদন করেছেন তিনি। ব্যক্তিগত ক্ষতি, রাজনৈতিক অত্যাচার, চাকরি হারানো, প্রাণনাশের হুমকি—সবকিছুর মধ্যেও আদর্শচ্যুত হননি।১৯৬৯ সালে মাত্র ১১-১২ বছর বয়সে প্রথমবার রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ বা আরএসএস-এর সঙ্গে পরিচয় ঘটে অসিত কুন্ডুর। তাঁর আদি বাড়ি গৌরহাটি হলেও পরবর্তীতে গোঘাটের বালিবেলাতেই বেড়ে ওঠা। স্বামী অসীমানন্দের হাত ধরেই সংঘের কার্যকলাপের সঙ্গে যুক্ত হন তিনি। সেই সময় আরামবাগ অঞ্চলের প্রচারক ছিলেন বিজয় আঢ্য। অসিতবাবুর বাবা মানিক লাল কুন্ডু ছিলেন কংগ্রেসপন্থী মানুষ। স্বাভাবিকভাবেই ছেলের গতিবিধি নিয়ে তিনি চিন্তিত হয়ে পড়েন। কোথায় যাচ্ছে, কার সঙ্গে মিশছে—সবকিছু নজরে রাখতে শুরু করেন। কিন্তু ধীরে ধীরে আরএসএস-এর কার্যকলাপ ও সংগঠনের শৃঙ্খলা তাঁর বাবারও ভালো লাগতে শুরু করে। পরবর্তীতে ১৯৭০-৭১ সালের সময়ে মানিক লালবাবুও বিশ্ব হিন্দু পরিষদের সঙ্গে যুক্ত হন। ১৯৭৫ সালে দেশজুড়ে জরুরি অবস্থা জারি হলে বিরোধী রাজনৈতিক ও আদর্শিক সংগঠনগুলোর ওপর নেমে আসে দমন-পীড়ন। সেই সময় অসিত কুন্ডুর নামেও ওয়ারেন্ট জারি হয়। কংগ্রেসের তৎকালীন বিধায়ক মদনমোহন মেদ্দার সহায়তায় তিনি আত্মগোপনে যেতে বাধ্য হন। পরবর্তী সময়ে বহু সংঘ ও জনসংঘ কর্মী সত্যাগ্রহ আন্দোলনে অংশ নিয়ে কারাবরণ করেন। বিজয় আঢ্য ও স্বামী অসীমানন্দের মতো সংগঠকেরাও জেল খাটেন। নব ধারা, সুকুমার সরকার, রমা পালের মতো সহকর্মীদের সঙ্গে তখন থেকেই ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তৈরি হয় অসিতবাবুর। যদিও তাঁর বাবা কংগ্রেসি হওয়ায় প্রশাসনিকভাবে কিছুটা রক্ষা পান এবং তাঁকে জেলে যেতে হয়নি।১৯৮০ সালে ভারতীয় জনতা পার্টির জন্মের পর সংঘ পরিবারের কর্মীদের একাংশকে সরাসরি রাজনৈতিক সংগঠনে কাজ করার দায়িত্ব দেওয়া হয়। সেই সময় প্রচারক রথীন চক্রবর্তীর নেতৃত্বে ১৯৮৫ সালে অসিত কুন্ডুকে আরামবাগ মহকুমায় বিজেপির কাজে ডিপুট করা হয়। একই সময় শ্রীরামপুর থেকে শ্যামল বসু এবং জাঙ্গিপাড়া থেকে শিবাজী দত্তকেও সংগঠনের কাজে পাঠানো হয়েছিল। তখনকার দিনে বিজেপি বা হিন্দুত্ববাদী রাজনীতি আজকের মতো বিস্তৃত ছিল না। সাধারণ মানুষের মধ্যেও রাজনৈতিক সচেতনতা সীমিত ছিল। অসিত কুন্ডুদের লক্ষ্য ছিল মূলত হিন্দু সমাজকে সংগঠিত করা এবং সাংগঠনিক ভিত শক্ত করা। ১৯৯০ সালে তৎকালীন শাসকদলের প্রবল চাপ ও বাধা উপেক্ষা করে বালিবেলায় নিজের বাড়িতেই রামশিলা পূজনের আয়োজন করেন অসিত কুন্ডু। সেই সময় গ্রামাঞ্চলে এ ধরনের কর্মসূচি ছিল অত্যন্ত স্পর্শকাতর এবং ঝুঁকিপূর্ণ। তারপর থেকেই তাঁর এবং তাঁর পরিবারের ওপর চাপ বাড়তে থাকে। ১২ মে ১৯৯২ সালে তাঁর বাবার রহস্যজনক মৃত্যুকে তৎকালীন প্রশাসন “অ্যাক্সিডেন্টাল মার্ডার” বলে উল্লেখ করেন। তাঁর অভিযোগ, রাজনৈতিক কারণেই এই ঘটনা ঘটেছিল। অসিতবাবুর বাবা বালিবেলা সরস্বতী শিশু মন্দির প্রতিষ্ঠার জন্য জমি দান করেছিলেন। সেই সূত্রেও পরিবারটি একটি আদর্শিক লড়াইয়ের প্রতীক হয়ে ওঠে। ১৯৮৩ সালে হোমিওপ্যাথি পাশ করার পর আরামবাগ পৌরসভায় মেডিক্যাল অফিসার হিসেবে কাজ শুরু করেন অসিত কুন্ডু। তখন আরামবাগ পৌরসভার চেয়ারম্যান ছিলেন বি কে রায়। কিন্তু পরবর্তীতে গোপাল কচের আমলে বিজেপি করার “অপরাধে” তাঁর চাকরি চলে যায় বলে অভিযোগ। শুধু তাই নয়, তিনি ১৩টি জায়গায় চেম্বার করতেন। সেখানেও স্থানীয় সিপিএম নেতৃত্বের তরফে নিয়মিত ভয় দেখানো হতো বলে দাবি করেন তিনি। ক্রমাগত চাপ সৃষ্টি করা হয় সিপিএমে যোগ দেওয়ার জন্য। পরিবারের জমিজমাও বর্গা হয়ে যায়। ১৯৯৮ সালের দিকে তাঁকে খুন করার চক্রান্ত হয়েছিল বলেও অভিযোগ তাঁর। আরামবাগে থেকে ফেরার পথে তার ওপর বোমাবাজির ঘটনাও ঘটে। কিন্তু বাবার মৃত্যুর পর তিনি আরও দৃঢ়ভাবে সংগঠনের কাজে ঝাঁপিয়ে পড়েন। সংগঠনের ভিতরেও শুরুতে নানা বাধা ও বিরোধিতার মুখে পড়তে হয়েছিল অসিত কুন্ডুকে। তবুও ধীরে ধীরে তিনি আরামবাগ অঞ্চলে বিজেপির অন্যতম মুখ হয়ে ওঠেন। ১৯৯৬-৯৭ সালে তিনি আরামবাগ টাউন বিজেপির সাধারণ সম্পাদক হন। ১৯৯৮-৯৯ সালে অবিভক্ত হুগলি জেলার সম্পাদক পদে দায়িত্ব পান। একইসঙ্গে আরএসএস-এর আরামবাগ মহকুমার শারীরিক প্রমুখ হিসেবেও কাজ করেন। পরবর্তীতে ২০১৪ সাল পর্যন্ত জেলা সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০১৪ সালে আরামবাগ সাংগঠনিক জেলা গঠিত হলে তার প্রথম সভাপতি হন অসিত কুন্ডু। ২০১৬ সালে তিনি বিজেপির রাজ্য কমিটির সদস্য নির্বাচিত হন। বর্তমানে তিনি বিজেপির ন্যাশনাল কাউন্সিল মেম্বার হিসেবেও যুক্ত আছেন। অসিত কুন্ডুর বক্তব্য, “রাষ্ট্রবাদী ও হিন্দুত্ববাদী চিন্তাধারা না থাকলে দেশ ও আগামী প্রজন্ম বিপদের মুখে পড়বে।” তিনি মনে করেন, দীর্ঘদিন ধরে বাইরের দেশ থেকে অবৈধ অনুপ্রবেশ ভারতের সামাজিক ভারসাম্য নষ্ট করেছে। তাঁর মতে, আরএসএস ও বিজেপির মধ্যে সরাসরি সাংগঠনিক সম্পর্ক না থাকলেও সংঘের আদর্শে গড়া বহু কর্মী বিজেপিতে কাজ করেন। তাঁর জীবনের মূল লক্ষ্য ছিল “হিন্দু রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন”। রাজনৈতিক জীবনের শেষ পর্বে এসে ব্যক্তিগত ক্ষতি বা না-পাওয়ার হিসাব আর তাঁকে ভাবায় না বলেই জানান তিনি। তাঁর কথায়, “সরকার গঠন হয়েছে, এটাই সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।” অসিত কুন্ডু মনে করেন বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে শুভেন্দু অধিকারীই পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার জন্য উপযুক্ত ব্যক্তি। তাঁর দাবি, দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান এবং প্রশাসনিক দক্ষতার কারণেই শুভেন্দু অধিকারীকে সামনে আনা হয়েছে। অসিত কুন্ডুর জীবন শুধুমাত্র একজন রাজনৈতিক নেতার গল্প নয়; এটি এক আদর্শনিষ্ঠ কর্মীর দীর্ঘ সংগ্রামের দলিল। রাজনৈতিক ক্ষমতা বা ব্যক্তিগত স্বার্থের চেয়ে সংগঠন ও মতাদর্শকে বড় করে দেখার মানসিকতা আজকের দিনে বিরল।জরুরি অবস্থার অন্ধকার সময় থেকে শুরু করে গ্রামবাংলায় হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির বিস্তার—প্রতিটি অধ্যায়ের সঙ্গে জড়িয়ে আছে তাঁর নাম। তার হাত ধরে উঠে এসেছে বিজেপিতে অনেক নেতা। অত্যাচার, বঞ্চনা, হামলা, চাকরি হারানো, পারিবারিক ক্ষতি—সবকিছুর পরেও সংগঠনের পতাকা হাতে রেখে যিনি পথ চলেছেন, তাঁর জীবন নিঃসন্দেহে এক রাজনৈতিক কর্মীর আত্মত্যাগ, নিষ্ঠা এবং মানসিক দৃঢ়তার এক অনন্য উদাহরণ।

Loading