September 29, 2026

তন্তুজের নামফলক আজও জ্বলজ্বল, শুধু বন্ধ দরজার ওপারে নেই সেই চেনা ভিড়

আরামবাগে বন্ধ তন্তুজ আউটলেট ঘিরে নস্টালজিয়া, প্রশ্ন কবে খুলবে আবার?

সোমালিয়া ওয়েব নিউজ: বাংলার তাঁতের শাড়ি বললেই একসময় অনেকের মনে ভেসে উঠত একটি নাম—‘তন্তুজ’। জামদানি, বালুচরি, টাঙ্গাইল কিংবা সুতির শাড়ি—পছন্দের কত রকম সম্ভারই না মিলত এক ছাদের নিচে। শুধু শাড়ি নয়, ধুতি, লুঙ্গি, পাঞ্জাবি, বেডশিট থেকে শুরু করে নানা ধরনের সুতির পোশাক—বাংলার মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত পরিবারের নিত্যপ্রয়োজনের সঙ্গে যেন জড়িয়ে ছিল এই নামটি।

১৯৫৪ সালে প্রতিষ্ঠিত তন্তুজের অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল রাজ্যের তাঁত সমবায় সমিতিগুলির তৈরি হস্তনির্মিত পণ্যকে বাজারজাত করা। সেই সূত্রেই ধীরে ধীরে বাংলার ঘরে ঘরে পরিচিত হয়ে ওঠে তন্তুজ। আরামবাগেও নব্বইয়ের দশকের গোড়ায়, ১৯৯২-৯৩ সালে, প্রথম তন্তুজ আউটলেট চালু হয়। তারপর কেটে গিয়েছে তিন দশকেরও বেশি সময়।

একসময় পুজোর আগে আরামবাগের এই দোকানে দেখা যেত ক্রেতাদের ভিড়। নতুন শাড়ি কেনার আনন্দে কেউ পরিবারের সদস্যদের নিয়ে আসতেন, কেউ বা পছন্দের ধুতি-পাঞ্জাবি কিংবা ঘরের জন্য বেডশিট কিনতেন। তুলনামূলকভাবে সাশ্রয়ী দামে ভালো মানের পোশাক পাওয়ার কারণে বহু পরিবারের কাছে তন্তুজ হয়ে উঠেছিল নির্ভরতার ঠিকানা।

কিন্তু আজ সেই ছবিটা বদলে গিয়েছে।

দোকান বন্ধ। সাটারে তালা। মাথার উপরে এখনও জ্বলজ্বল করছে ‘তন্তুজ’-এর নামফলক। অথচ সেই নামফলকের গায়েও সময়ের ছাপ। ধুলো-ঝুল জমেছে দোকানের চারপাশে। পাশে এখনও ঝুলছে বহু পুরনো একটি বিশেষ ছাড়ের পোস্টার—যেন অতীতের সেই ব্যস্ত দিনগুলির শেষ সাক্ষী হয়ে।

২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের ফল প্রকাশের কয়েকদিন পর দোকানের সাটারে একটি নোটিশও দেখা যায়। সেখানে গত পাঁচ বছরে প্রায় ৭৫ হাজার টাকা বকেয়া থাকার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। বিষয়টি সামনে আসতেই নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে—সরকারি সংস্থা তন্তুজের একটি আউটলেটের পৌরসভার কাছে এই বকেয়া কীভাবে তৈরি হল? আর ভোটের রেজাল্টের পরেই কেন এই নোটিশ দেওয়া হলো? কেনই বা এতদিন তা মেটানো হল না? আর এত বছর ধরে দোকানটি বন্ধ থাকলেও সেটি পুনরায় চালুর উদ্যোগ কেন নেওয়া হয়নি?

এই প্রশ্নের উত্তর এখনও স্পষ্ট নয়। দোকানের কর্মীদেরও অন্যত্র বদলি করা হয়েছে বলে জানা গিয়েছে। ফলে ধীরে ধীরে বন্ধ দরজাটি যেন আরামবাগের মানুষের স্মৃতির দরজায় পরিণত হয়েছে।

প্রতি বছর পুজোর আগে এখনও অনেক পুরনো ক্রেতা অভ্যাসবশত দোকানের সামনে এসে দাঁড়ান। হয়তো মনে মনে ভাবেন, এ বছর আবার খুলেছে কি না। তারপর জানতে পারেন—‘দোকান বন্ধ।’

একসময় যে দোকানে ঢুকে শাড়ির রং বাছাই করা, কাপড় ছুঁয়ে তার মান বোঝা, পরিবারের পছন্দ-অপছন্দ নিয়ে আলোচনা করা ছিল কেনাকাটার স্বাভাবিক আনন্দ, সেই অভিজ্ঞতা এখন অনেকটাই চলে গিয়েছে অনলাইন দুনিয়ায়। তন্তুজও বর্তমানে অনলাইন কেনাকাটার সুযোগ চালু করেছে। কিন্তু বহু মানুষের কাছে মোবাইলের পর্দায় পছন্দের কাপড় দেখা আর দোকানের তাক থেকে নিজের হাতে শাড়ি তুলে নেওয়ার অনুভূতি এক নয়।

তাই আরামবাগের তন্তুজের বন্ধ দরজা শুধু একটি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের বন্ধ হয়ে যাওয়ার গল্প নয়। এর সঙ্গে মিশে রয়েছে বহু মানুষের ব্যক্তিগত স্মৃতি, পুজোর কেনাকাটা, পরিবারের পছন্দের শাড়ি এবং একসময়ের চেনা বাজারের ছবি।

বিষয়টি নিয়ে জানতে চাওয়া হয়  বিধায়ক প্রশান্ত দিগারের কাছে। তিনি জানান, তন্তুজের আউটলেট বন্ধ থাকার বিষয়টি সম্পর্কে তাঁর কাছে এই মুহূর্তে সঠিক তথ্য নেই। তবে তিনি বিষয়টি নিয়ে খোঁজখবর নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছেন।

অন্যদিকে, বিজেপির প্রাক্তন আরামবাগ সাংগঠনিক জেলা সভাপতি সুশান্ত বেরাও বিষয়টি নিয়ে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানিয়েছেন।

স্থানীয় অনুপ মুখোপাধ্যায়, শিবনাথ শীল-সহ পাশের দোকানদারদের অনেকেই চান, আবার খুলুক আরামবাগের তন্তুজ। তাঁদের বক্তব্য, এত পুরনো একটি সরকারি বিপণি এভাবে বন্ধ পড়ে থাকা কাম্য নয়। বিশেষ করে পুজোর মরশুমে দোকানটি আবার খুললে পুরনো ক্রেতাদের পাশাপাশি নতুন প্রজন্মের মানুষও উপকৃত হবেন।

সময় বদলেছে। কেনাকাটার ধরন বদলেছে। অনলাইন এসেছে। কিন্তু কিছু কিছু জায়গার সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক শুধুমাত্র কেনাবেচার নয়—তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকে স্মৃতি।

আরামবাগের তন্তুজও তেমনই একটি নাম। আজও তার নামফলকটি দেখা যায়। শুধু নেই সেই আলো, নেই ক্রেতাদের ভিড়, নেই কাপড়ের সারি, নেই পুজোর কেনাকাটার সেই ব্যস্ততা। কাচঘেরা বন্ধ দোকানের ভিতরে জমে থাকা ধুলো যেন সাক্ষী হয়ে আছে একটি সময়ের।

তাই আরামবাগবাসীর মনে এখন একটাই প্রশ্ন—

আবার কি খুলবে তন্তুজের সেই চেনা দরজা? পুজোর আগে কি ফিরবে শাড়ি, ধুতি-পাঞ্জাবি আর সুতির পোশাকের সেই পরিচিত সম্ভার? আবার কি নামফলকের নিচে জমবে ক্রেতাদের ভিড়?

উত্তর এখনও অজানা। তবে বন্ধ সাটারের ওপারে, আরামবাগের বহু মানুষের মনে তন্তুজের জন্য অপেক্ষাটা যে এখনও শেষ হয়নি—সেটুকু স্পষ্ট।

Loading