October 25, 2026

বেঙ্গাইয়ের দুই লক্ষ্মীতলা, ২১৩ ও ১৬৩ বছরের ইতিহাসে আজও অমলিন বিশ্বাস ও ঐতিহ্য

সোমালিয়া ওয়েব নিউজ: একটি গ্রাম, দুটি প্রাচীন লক্ষ্মীপুজো, আর তার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে শত শত বছরের ইতিহাস, বিশ্বাস ও মানুষের আবেগ। সময়ের স্রোতে বদলেছে অনেক কিছু, বদলেছে মানুষের জীবনযাত্রা। কিন্তু বদলায়নি মা লক্ষ্মীর প্রতি ভক্তি, পারিবারিক বন্ধন আর গ্রামবাসীর মিলিত উৎসবের আনন্দ।

আমরা এসেছি হুগলি জেলার বেঙ্গাই গ্রামে। এখানে পাশাপাশি রয়েছে ছোট লক্ষ্মীতলা ও বড় লক্ষ্মীতলা। একটির বয়স ২১৩ বছর, অন্যটির ইতিহাস প্রায় ১৬৩ বছরের। দুই পুজোকে ঘিরেই আজও এক অন্যরকম আবেগে মেতে ওঠেন গ্রামের মানুষ।

প্রথমেই আসা যাক বেঙ্গাইয়ের ছোট লক্ষ্মীতলায়।

২১৩ বছরের দীর্ঘ পথ চলা। সাতটি পরিবারকে নিয়ে যে পুজোর সূচনা, আজ সেই পুজোয় যুক্ত হয়েছে মোট ৩৯টি পরিবার। মাধব মোহন মুখার্জি ও প্রভাত কুমার ভট্টাচার্য জানান, কথিত আছে, এই পুজোর ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে শ্রীশ্রী রামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের দীক্ষাগুরু কেনারাম ভট্টাচার্যের নাম।

একসময়ের ছোট্ট পারিবারিক উদ্যোগ আজ পরিণত হয়েছে বৃহত্তর মিলন উৎসবে। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসছে মা লক্ষ্মীর আরাধনা। আর সেই আরাধনাকে কেন্দ্র করেই তৈরি হয়েছে আত্মীয়তার বন্ধন, পারস্পরিক সম্প্রীতি ও গ্রামের মানুষের একাত্মতার এক অনন্য নজির।

এখানে লক্ষ্মীপুজো মানে শুধু দেবীর আরাধনা নয়, বরং টানা আট দিনের উৎসব। পুজোর পাশাপাশি বসে মেলা, অনুষ্ঠিত হয় যাত্রাপালা ও নানা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। দূরদূরান্তে ছড়িয়ে থাকা আত্মীয়স্বজন ফিরে আসেন নিজের শিকড়ের টানে। ছোটদের কাছে পরিচিত হয়ে ওঠে পূর্বপুরুষদের ঐতিহ্য, আর বড়দের স্মৃতিতে ফিরে আসে পুরনো দিনের কথা।

সাতটি পরিবার থেকে ৩৯টি পরিবারের এই দীর্ঘ যাত্রা যেন বলে দেয়, ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রাখার শক্তি লুকিয়ে রয়েছে মানুষের সম্মিলিত ভালোবাসার মধ্যে।

কিন্তু বেঙ্গাইয়ের লক্ষ্মী আরাধনার ইতিহাসে রয়েছে আরও একটি গৌরবময় অধ্যায়—বড় লক্ষ্মীতলা।

ছোট লক্ষ্মীতলার পাশেই অবস্থিত বড় লক্ষ্মীতলার পুজোও বহন করে চলেছে প্রায় ১৬৩ বছরের ঐতিহ্য। গোরাচাঁদ গোস্বামী জানান, এই পুজোর শুরুর দিনগুলিতে ছিল না আজকের মতো পাকা মন্দির কিংবা উন্নত পরিকাঠামো। প্রথমে তালপাতার ছাউনি দিয়ে পুজোর ব্যবস্থা করা হয়েছিল। পরে সেই ছাউনি বদলে হয় খড়ের, এরপর আসে টিনের আচ্ছাদন।

পুজোর সঙ্গে যুক্ত পরিবারগুলির আর্থিক অবস্থা একসময় ছিল অত্যন্ত খারাপ। সীমিত সামর্থ্যের মধ্যেই চলত মা লক্ষ্মীর আরাধনা। পরবর্তীকালে পরিবারের আর্থিক অবস্থার উন্নতি হলে ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে মন্দির। এভাবেই অভাব-অনটনের দিন পেরিয়ে বড় লক্ষ্মীতলার পুজো পেয়েছে নতুন রূপ, কিন্তু ধরে রেখেছে তার পুরনো ঐতিহ্য।

বড় লক্ষ্মীতলাতেও পুজো উপলক্ষে টানা আট দিন ধরে চলে মেলা। যাত্রাপালা ও বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে মুখরিত হয়ে ওঠে গোটা প্রাঙ্গণ। উৎসবের আনন্দে একত্রিত হন গ্রামের মানুষ। ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের পাশাপাশি এই পুজো হয়ে ওঠে সামাজিক যোগাযোগ ও সাংস্কৃতিক চর্চার অন্যতম কেন্দ্র।

সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয়, এই পুজো আর উদ্যোক্তা পরিবারগুলির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। আজ তা গোটা বেঙ্গাই গ্রামের মানুষের পুজো। গ্রামের ছোট-বড় সকলের অংশগ্রহণেই তৈরি হয়েছে এক বৃহত্তর সামাজিক বন্ধন।

দুটি পুজো, দুটি ইতিহাস—কিন্তু মিলনের সুর একই।

একদিকে ২১৩ বছরের ছোট লক্ষ্মীতলা, অন্যদিকে ১৬৩ বছরের বড় লক্ষ্মীতলা। দীর্ঘ সময় ধরে এই দুই পুজো গ্রামের মানুষের কাছে শুধু ধর্মীয় উৎসব নয়, বরং পূর্বপুরুষদের স্মৃতি, পারিবারিক ঐতিহ্য এবং সামাজিক সম্প্রীতির উত্তরাধিকার।

আট দিন ধরে মেলা, যাত্রা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে বেঙ্গাই যেন নতুন করে খুঁজে পায় তার শিকড়কে। প্রজন্ম বদলালেও এই ঐতিহ্যকে আঁকড়ে ধরে রাখার মধ্যেই রয়েছে গ্রামের মানুষের গর্ব।

মা লক্ষ্মীর কাছে একটাই প্রার্থনা—এই দুই প্রাচীন পুজোর ঐতিহ্য অক্ষুণ্ণ থাকুক। আগামী প্রজন্মও যেন একই নিষ্ঠা, বিশ্বাস ও ভালোবাসায় এগিয়ে নিয়ে যায় এই পরম্পরা।

বেঙ্গাইয়ের ছোট ও বড় লক্ষ্মীতলা ইতিহাসের দুই অধ্যায়, বিশ্বাসের এক বন্ধন, আর গোটা গ্রামের মিলন ও সম্প্রীতির চিরন্তন উৎসব।

Loading